জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে তুরস্কের

নিউজ ডেস্ক : তুরস্কের ক্ষমতাসীন এরদোগান সরকারের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’র। সম্প্রতি জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর ফাঁসির পর দেশটির দায়সারা বিবৃতিতে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
যদিও জামায়াতের সঙ্গে এতদিন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল তুরস্কের। যে কারণে মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াত নেতাদের বিচার চলাকালে এবং শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর দেশটি তীব্র প্রতিক্রিয়াও জানায়। কিন্তু গত জুলাইয়ে তুরস্কে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ এরদোগান সরকারকে সমর্থন জানিয়ে অভ্যুত্থানের নিন্দা জানায়। এর পরপরই বাংলাদেশের প্রতি তুরস্কের মনোভাব পাল্টে যায়। তারা বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব আরও ঘনিষ্ঠ করার প্রয়াস নেয়।
বিংশ শতাব্দির প্রথমদিকে প্রতিষ্ঠিত ধর্মভিত্তিক সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের অনেকগুলো শাখার একটি হচ্ছে তুরস্কের ক্ষমতাসীন জাস্টিস এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি এবং আরেকটি হচ্ছে জামায়াত ইসলামি। সে কারণেই বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের বিচার প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই তুরস্ক বিরোধিতা করে আসছিল এবং একাধিকবার তারা এ প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেছে। যখনই কোনও যুদ্ধাপরাধীর মুত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, তখনই তারা জোরালো বিবৃতি দিয়েছে।

মে মাসে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ডের পরও তুরস্ক তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং একাধিক বিবৃতি দেয়। কিন্তু গত ৩ সেপ্টেম্বর জামাতের অন্যতম শীর্ষনেতা ও দলের অর্থ যোগানদাতা মীর কাসেমের মৃত্যুদণ্ডের পরে দায়সারা গোছের একটি বিবৃতি দেয়, যা অনেককে অবাক করেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত মহিউদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে তুরস্কের ক্ষমতাসীন দলের যে পুরনো সম্পর্ক ছিল, সেখান থেকে তারা সরে এসেছে। মুসলিম ব্রাদারহুডের অনেকগুলো ফ্র্যাঞ্চাইজি আছে। একেক দেশে দলটি একেক নামে পরিচিত, যেমন তুরস্কে জাস্টিস এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি, আর বাংলাদেশে এর নাম জামায়াতে ইসলামী।’
পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন চাপ এবং পরিস্থিতির কারণে তুরস্ক তাদের নতুন অবস্থান নিয়েছে বলেও জানান সাবেক এই রাষ্ট্রদূত।
তুরস্কে গত ১৫ জুলাইয়ে সংঘটিত ব্যর্থ অভ্যুত্থানের ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির কূটনৈতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলে। এরদোগান সরকার বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে আগের কূটনৈতিক অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে আসে।
এ প্রসঙ্গে মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সেজন্যই মীর কাসেমের ফাঁসির পর, না করলেই নয় এমন একটি প্রতিক্রিয়া তারা দেখিয়েছে।’
মীর কাসেমের ফাঁসির দু’দিন পর তুরস্ক এক প্রতিক্রিয়ায় বলে, তারা এ মৃত্যুদণ্ডের জন্য দুঃখিত। অথচ, পাকিস্তান মীর কাসেমের ফাঁসির দু’ঘণ্টার মধ্যে একটি অগ্রহণযোগ্য বিবৃতি দেয়।
গত মে মাসে জামায়াতের আমির নিজামির ফাঁসির পর তুরস্কের এরদোয়ান বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য দেন এবং গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নেবেন।
মহিউদ্দিন বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক অনেক পুরনো। ১৯৩৫ সালে নোয়াখালীর দাগনভূইয়ায় আতার্তুক হাই স্কুল নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়।’তিনি মনে করেন, ‘তুরস্কের মনোভাব পরিবর্তনের জন্য দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশকেও যোগাযোগ বাড়াতে হবে।’তিনি বলেন, ‘তারা হালকাভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, আমাদেরও বিষয়টি জোরালোভাবে দেখার অবকাশ নেই।’
সাবেক রাষ্ট্রদূত শাহেদ আক্তার বলেন, ‘প্রতিটি দেশই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে তাদের অবস্থান বদলায়। সব দেশই নিজেদের অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেয়। তুরস্কও এর ব্যতিক্রম নয়।’তিনি মনে করেন, ‘তারা কোনও শক্ত অবস্থানে না গিয়ে নমনীয় অবস্থান নিয়েছে। বলা যায়, পূর্বের অবস্থা থেকে সরে এসেছে। তুরস্ক তার জাতীয় স্বার্থে যা করার দরকার সেটাই করছে এবং একটি ব্যালান্সড অবস্থান নিয়েছে।’
গত মে মাসে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির পর তুরস্ক তার রাষ্ট্রদূত দেভরিম ওজটার্ককে আলোচনার জন্য আঙ্কারায় ডেকে পাঠায়। তিনি প্রায় তিন মাস পরে ঢাকায় ফেরেন।
প্রসঙ্গত, ২০১২ সালে তুরস্কের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুল্লাহ গুল বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের কাছেও মানবতাবিরোধী বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে চিঠি দিয়েছিলেন।

Print Friendly, PDF & Email
basic-bank

Be the first to comment on "জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে তুরস্কের"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*