লোহাগড়ায় কৃষি কর্মকর্তার উদাসীনতা ‘ডিলার সিন্ডিকেটে’ জিম্মি কৃষক,চড়া দামে কিনছেন সার

লোহাগড়ায় কৃষি কর্মকর্তার উদাসীনতা ‘ডিলার সিন্ডিকেটে’ জিম্মি কৃষক,চড়া দামে কিনছেন সার

নিউজ ডেস্ক॥ নড়াইলের লোহাগড়ায় ‘ডিলারদের ‘সিন্ডিকেটের’ কারণে জিম্মি হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। অভিযোগ রয়েছে ডিলাররা তাদের ইচ্ছামতো কৃষকদের অতিরিক্ত টাকায় সার কিনতে বাধ্য করছেন। এ জন্য কর্তৃপক্ষের মনিটরিং না থাকাকে দায়ী করছেন ভুক্তভোগীরা।

জানা যায়, উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ড্রাষ্টিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া আছে। শর্ত রয়েছে, ওই সব ডিলার তাদের স্ব স্ব ইউনিয়নে ব্যবসা পরিচালনা করবেন। অথচ অধিকাংশ সার ডিলার ব্যবসা পরিচালনা করছেন পৌরশহরের মধ্যে। এছাড়া সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার কিনতে পারছেন না লোহাগড়ার প্রান্তিক কৃষকরা। ডিলারদের সিন্ডিকেটের ফলে চড়া দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছে তারা। চলতি ইবি-বোরো মৌসুমে অধিকমূল্যে সার কেনার ফলে লোকসানের মুখে পড়ার আশঙ্কা উপজেলার প্রায় লক্ষাধিক কৃষকের। তবে, সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা এ সব অভিযোগ অস্বীকার করছেন। লোহাগড়া উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সমোরেন বিশ্বাস বলেন, ‘এই উপজেলায় ১৩ জন বিসিআইসি ডিলার এবং ৯৭ জন সাব ডিলার প্রান্তিক কৃষকদের সার দেওয়ার জন্য নির্ধারিত রয়েছেন। কেউ অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযুক্ত ডিলারদের দাবি, যানবাহনে অধিক খরচ ও সড়কের বেহালদশার কারণে শহরের গোডাউনে রেখে সার বিক্রি করছেন তারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, লোহাগড়া পৌর এলাকায় অবস্থিত লোহাগড়া বাজারে রয়েছে জয়পুর ইউনিয়নসহ একাধিক ইউনিয়নের ডিলার ও সাব ডিলার। সিডি বাজার ও তাদের স্বস্ব ইউনয়ন গোডাউনে রেখে প্রান্তিক কৃষকদের কাছে সার বিক্রির কথা। এ সব ইউনিয়নের কৃষকরা পরিবহন খরচ আর সময় বাঁচাতে এলাকার খুচরা দোকান থেকে বেশিদামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। জয়পুর ইউনিয়নের চাঁচই গ্রামের কৃষক শেখ জামাল হোসেন বলেন, ‘আমাদের এলাকায় সারের কোনো ডিলার আছে কিনা জানা নেই। আমরা লোহাগড়া পৌর শহর থেকে সার কিনে জমি চাষ করি। এলাকায় সার বিক্রি করলে আমাদের গাড়ি ভাড়া ও সময় বাঁচতো। আড়িয়ারা গ্রামের সোহরাব শেখ বলেন,আমরা প্রতিকেজি ইউরিয়া সার ১৮ টাকা দরে কিনেছি, সার যখন পাওয়া যায়না তখন ২২ থেকে ২৫টাকায় কিনতে হয়। অথচ সরকার নির্ধারিত মূল্য ১৬ টাকা। জয়পুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আখতার হোসেন বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়নে সারের ডিলার আছে কিনা? কি নাম তার সেটাইতো জানিনা। এই ইউনিয়নে কোন ডিলার সার বিক্রি করে না। সার বিক্রি হয় পৌরশহরে। ডিলার না থাকায় এলাকার কৃষকরা ক্ষতি গ্রস্থ হচ্ছে। স্বস্ব ডিলার তাদের নির্ধারিত ইউনিয়নে নায্য মূল্যে সার বিক্রি করলে কৃষক উপকৃত হতো। নোয়াগ্রাম ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আনোয়ারুল কবির, তিনি নোয়াগ্রাম ইউনিয়নের বাসিন্দা হলেও জয়পুর ইউনিয়ন সার ডিলার নিযুক্ত হন। তিনি জয়পুর সিডি বাজারে গোডাউনে রেখে সার বিক্রির নিয়ম থাকলেও প্রায় দশ বছর পৌর শহরের পরশমনি শ্বশানঘাট গোডাউন এবং পৌর শহরের সার ডিলার, ‘আরএস এন্টার প্রাইজ’ সরকার পাড়ায় নাম কাওয়াস্তে গোডাউন দেখিয়ে বরাদ্দকৃত সার গোডাউনে পৌছানোর আগেই ট্রাকের ওপর থেকে চড়া দামে খুচরা ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে সামান্য সার গোডাউনে রেখে দেয় বলে জানান কয়েকজন সার বিক্রেতা। সার বিতরন সংক্রান্ত নীতিমালা লংঘন ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে বাহার এন্টার প্রাইজ,প্রোপাইটর বিএনপি নেতা হাবিবুল্লাহ বাহার তৎকালিন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকা কালিন সার ডিলার নিয়োগ নিজ নামে নলদী ইউনিয়নের মিঠাপুর বাজার এবং বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর তার ভাই আইয়ুব হোসেন,মল্লিকপুর ইউনিয়নের পাচুড়িয়া বাজার, ছেলে আল মাসুম আজাদ কাশিপুর ইউনয়নের এড়েন্দা বাজার ও তার স্ত্রী মিসেস জাকিয়া বাহার নড়াইল সদর উপজেলার হবখালী ইউনিয়নের পাজারখালী বাজার ও জেলা সদর ও লোহাগড়া উপজেলার অন্য ইউনয়নে নিকট আত্মীয়ের নাম স্বর্বচ্ছ দেখিয়ে সারের ডিলার নিয়োগ পেয়ে উপজেলায় সার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্যবসা করে আসছেন। নড়াইল সদর উপজেলায় সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রন করেন মাইজপাড়া বাজারের বিসিআইসি সার ডিলার অলোক কুমার কুন্ডু।

সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে স্বস্ব ইউনিয়নের নাগরিকগন কেবলমাত্র আবেদন করতে পারবে। এক ইউনিয়নের নাগরিক অন্য ইউনিয়নের ডিলার হতে পারবে না। দেখা যায়,‘আরএস এন্টার প্রাইজ’ প্রোপাইটর যশোর শার্শা উপজেলার বিসিআইসি ডিলার ও শার্শার স্থায়ী বাসিন্দা শুভাশীষ কুন্ডু, তিনি কাগজে কলমে লোহাগড়া উপজেলার শালনগর ইউনিয়নে বাড়ি দেখিয়ে লোহাগড়া পৌরসভার ডিলার নিয়োগ পান। নলদী ইউনিয়নের বাসিন্দা তরুন কুমার সাহাকে অনুরুপ ভাবে শালনগর ইউনিয়নের সার ডিলার নিয়োগ পাইয়ে দেয় হাবিবুল্লাহ বাহার। শালনগর ইউপি চেয়ারম্যান খান তসরুল ইসলাম বলেন, শুভাশীষ কুন্ডু তার ইউনিয়নের বাসিন্দা নন। তার নানা বাড়ি এ ইউনিয়নে ছিল, এখন নানা বাড়িরও কোন অস্তিত্ব নেই। প্রতিটি ইউনয়নের ওয়ার্ড পর্যায়ে একজন করে সাব ডিলার সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি করার নিয়ম থাকলেও অধিকাংশ ডিলারকে ওয়ার্ডে গিয়ে পাওয়া যায়নি। দেখা যায় তারা শহর ও গ্রামের হাটবাজারে ছোট পরিসরে ঘর ভাড়া করে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি মূল্যে সার বিক্রি করছেন। সেখানে নেই কোন মূল্য তালিকা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিসিআইসি শর্তানুযায়ী গোডাউন, সারের মজুদ, কৃষকের মাঝে বিক্রয় বিতরন মাষ্টাররোল শুধু কাগজে কলমে পরিদর্শন করেন বলে জানান কয়েকজন সার ব্যবসায়ী । উপজেলা কৃষি সম্প্রসারন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে দীর্ঘদিন সিন্ডিকেট ব্যবসার মাধ্যমে হাবিবুল্লাহ বাহার ও অলোক কুমার কুন্ডু কৃষি সেক্টরে রাম রাজত্ব কায়েম করে কৃষকের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিলেও কৃষি বিভাগ রয়েছে উদাশীন।

নড়াইল জেলা প্রশাসক ও সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি আনজুমান আরা সোমবার দুপুরে সাংবাদিকদের বলেন, ডিলারদের এ সব অবৈধ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যে সব ডিলার পৌরশহরে ব্যবসা করছেন তাদের স্ব স্ব ইউনিয়নে গিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে। এছাড়া অধিকমূল্যে সার বিক্রয় এবং অনিয়মকারীদের আইনের আওতায় আনা হবে।

Print Friendly, PDF & Email
basic-bank

Be the first to comment on "লোহাগড়ায় কৃষি কর্মকর্তার উদাসীনতা ‘ডিলার সিন্ডিকেটে’ জিম্মি কৃষক,চড়া দামে কিনছেন সার"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*