নিউজ ডেস্ক : গাজীপুরে শনিবার দু’টি পৃথক ‘জঙ্গি আস্তানায়’ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে নব্য জেএমবির ঢাকা বিভাগীয় কমান্ডার আকাশসহ সন্দেহভাজন ৯ জঙ্গি নিহত হওয়ার ঘটনায় রবিবার বিকেলে জয়দেবপুর থানায় পৃথক দু’টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। রবিবার বিকেলে নিহত ৯ জঙ্গীর ময়না তদন্ত গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে সম্পন্ন হয়েছে। এদিকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নিহতদের পরিচয় পাওয়া যায় নি এমনকি কেউই লাশের দাবী করেন নি।
গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ জানান, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নোয়াগাঁও পাতার টেকে শনিবার পুলিশের অভিযানের ঘটনায় ওই বাড়ীর তত্ত্বাবধায়ক (কেয়ারটেকার) ওসমান সরকার ও নিহত অজ্ঞাত সাত জনকে আসামী করে সন্ত্রাস দমন আইনে জয়দেবপুর থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। জয়দেবপুর থানার ওসি খন্দকার রেজাউল হাসান রেজা বাদী হয়ে রবিবার অস্ত্র আইনে মামলাটি দায়ের করেন। নিহত সাত জনকে আসামি করে অস্ত্র আইনে এ মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। তবে ঘটনার পর থেকে বাড়ির মালিকের ভাই ওই বাড়ির কেয়ার টেকার ওসমান সরকার পলাতক রয়েছে।
তিনি জানান, পাতার টেকের ওই বাড়িতে অভিযানকালে ঘটনাস্থল হতে পাকিস্তানের তৈরি একটি রিভলবারসহ তিনটি অস্ত্র এবং ২২ বোরের রাইফেলের প্রায় ১০০টি গুলির খোসা, ১০৫টি পিস্তলের গুলি পাওয়া গেছে। এসময় তাদের ব্যবহৃত ৩টি মোবাইল ফোন ও কাগজপত্রগুলো তারা পুড়ে ফেলেছে। অন্যান্য জায়গায় যা করেছে সেটা এখানেও করা হয়েছে, তারা আলামত নষ্ট করেছে। যেগুলো পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে আমরা সেগুলো জব্দ করেছি। আমরা তদন্ত করছি। ভাড়াটিয়ার তথ্য না জেনে বাড়িওয়ালা বাড়ি ভাড়া দিয়েছে, সে কারণে বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে আমরা অভিযোগ আনবো। পাশাপাশি বাড়ির কেয়ার টেকারকেও আইনের আওতায় নিয়ে আসবো। তদন্ত শেষে তাদের পরিচয় এবং সব কিছু বলা যাবে।
জয়দেবপুর থানার ওসি খন্দকার রেজাউল হাসান জানান, নোয়াগাঁও পাতার টেকের ঘটনায় নিহত ৭ জনের মধ্যে নব্য জেএমবির ঢাকা বিভাগের অপারেশন কামান্ডার ফরিদুল ইসলাম ওরফে আকাশ ওরফে প্রভাত থাকলেও লাশ পুরোপুরি সনাক্ত করা সম্ভব হয় নি। পৃথক দু’অভিযানে নিহত ৯ জনের পরিচয় পুরোপুরি নিশ্চিত হতে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ময়নাতদন্ত শেষে সবার লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হবে।
এদিকে, একইদিন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের হাড়িনাল লেবুবাগান এলাকার অপর একটি বাড়িতে র্যা ব-১ এর সদস্যদের অভিযানে দুই জঙ্গি নিহত হওয়ার ঘটনায় রবিবার দুপুরে র্যা ব’র পক্ষ থেকে অপর একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
র্যা ব-১-এর উপ-পরিচালক মোহাম্মদ মহিউল ইসলাম জানান, হাড়িনাল পশ্চিমপাড়ায় র্যা বের অভিযানে নিহত দুই জঙ্গির বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট অফিসার মো. জয়নাল আবেদীন বাদী হয়ে সন্ত্রাস দমন আইনে জয়দেবপুর থানায় এ মামলা দায়ের করেন।
গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদ জানান, গাজীপুরের এ বাড়িটি তাদের একটি ট্রেনিং সেন্টার ছিল। নতুন নতুন লোকদের এখানে এনে তারা ট্রেনিং দিত এবং নতুন কাজে উদ্বুদ্ধ করতো। যেহেতু এখন দেশে পূজা চলছে তাই তাদের হয়ত একটা নাশকতার পরিকল্পনা থাকতে পারে।
নিহত ওই ৯ জনের মধ্যে তিন জনের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা গেলেও পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারে নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ফলে পরিচয় পুরোপুরি নিশ্চিত হতে তাদের ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। নিহত এ নয়জনের লাশ ময়না তদন্তের জন্য ঘটনার রাতেই শহীদ তাজ উদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। রবিবার তাদের ময়না তদন্ত সম্পন্ন করা হয়। তবে এদিন বিকেল পর্যন্ত নিহতদের পরিচয় পাওয়া যায়নি। এমনকি তাদের খোঁজে সন্ধ্যা পর্যন্ত ওই হাসপাতালে বা থানায় কেউ আসেন নি বা যোগাযোগ করেন নি।
এদিকে, পৃথক দু’অভিযানে নিহত ৯ জঙ্গীর ময়নাতদন্তের কাজ শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে সম্পন্ন হয়েছে। শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের চিকিৎসকদের একটি দল রবিবার বিকেলে ওই ৯টি মরদেহের ময়নাতদন্ত কাজ সম্পন্ন করেন। অপর চিকিৎসকগণ হলেন ডা. আবুল কালাম আজাদ ও ডা. শেখ কামরুল করিম। সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লিখা পর্যন্ত নিহতদের লাশ এ হাসপাতালের মর্গে রাখা রয়েছে।
এছাড়াও, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের হাড়িনাল পশ্চিমপাড়া লেবু বাগান এলাকায় শনিবার র্যাাবের অভিযানে নিহত সন্দেহভাজন জঙ্গি তৌহিদুল ইসলাম ঢাকা প্রকৌশল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) শিক্ষার্থী নয় বলে জানিয়েছেন ডুয়েট কর্তৃপক্ষ। ডুয়েটের উপাচার্য মো. আলাউদ্দিন জানান, গাজীপুরে র্যা্বের অভিযানে নিহত দুই জঙ্গির মধ্যে একজন ডুয়েট ছাত্র তৌহিদুল ইসলাম মারুফ বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। ওই সংবাদের প্রেক্ষিতে আমরা বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখেছি তৌহিদুল ইসলাম নামে আমাদের কোনো ছাত্র শনিবার মারা যাননি। প্রকৃতপক্ষে এই তৌহিদুল ইসলাম ডুয়েটের ছাত্র নয়। ডুয়েটের একাডেমিক শাখা থেকে বর্তমান সব ছাত্রদের নথি ঘেটে তৌহিদুল ইসলাম নামে যে সাতজন ছাত্র পাওয়া গেছে তাদের কারো বাড়িই নরসিংদী নয়। এমনকি পত্রিকায় প্রকাশিত ছবির সঙ্গেও তাদের কারো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। উপরন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে উক্ত সাতজন তৌহিদুল ইসলামের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয়েছে প্রত্যেকেই ফোনে কথা বলেছেন এবং সবাই ভাল আছেন।
এব্যাপারে ডুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক মো. কামরুজ্জামান জানান, হাড়িনালে র্যােবের অভিযানে তৌহিদ নামে ডুয়েট শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার খবর বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচার হয়। ওই খবর পাওয়ার পর ডুয়েটে ওই নামের সকল ছাত্রের অনুসন্ধান চালানো হয়। তৌহিদ নামে আমাদের সাত শিক্ষার্থী থাকলেও তাদের কেউ শনিবার র্যাাবের অভিযানে নিহত হয়নি।
উল্লেখ্য, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নোয়াগাঁও পাতারটেক ও হাড়িনাল পশ্চিমপাড়া লেবু বাগান এলাকার দু’টি পৃথক ‘জঙ্গি আস্তানায়’ শনিবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে নব্য জেএমবির ঢাকা বিভাগীয় কমান্ডার আকাশসহ সন্দেহভাজন ৯ জঙ্গি নিহত হয়। এসময় পুলিশের দু’সদস্য আহত হন। ঘটনাস্থল থেকে একে-২২ রাইফেল, পিস্তল ও গুলিসহ বিপুল পরিমান বিষ্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে।

Be the first to comment on "৯ জঙ্গী নিহতের ঘটনায় মামলা ॥ লাশ নিতে আসেনি কেউ"