আবারও কি মদদ জঙ্গিবান্ধব রাজনীতিতে

নিউজ ডেস্ক: ২০১১ সালের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচনটি ভারতের লোকসভা নির্বাচনের মতোই আমাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে। সেবারের নির্বাচনে যখন ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে মমতা ক্ষমতায় এলেন, তখন থেকেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি নিয়ে আমাদের মধ্যে কৌতূহল ও উদ্দীপনা বেড়ে যায়।

এরপর থেকে সেখানে ধর্মীয় জঙ্গি হামলা, সারদা চিট ফান্ড কেলেঙ্কারি, তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনে বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর অর্থায়নের অভিযোগ, সারদার টাকা জামায়াতের বিভিন্ন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ এবং সারদা চিট ফান্ড কেলেঙ্কারির টাকা জেএমবির মতো জঙ্গি সংগঠনের মাধ্যমে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিনিয়োগের খবরাখবর পশ্চিমবঙ্গের বিষয়ে নতুন করে আমাদের আগ্রহের জন্ম দেয়।

মমতা ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আমরা এসব বিশ্লেষণ করতে শুরু করেছি। বিশেষ করে তিস্তার পানি চুক্তি নিয়ে আমাদের আগ্রহ অনেক। কারণ মমতার বাধার কারণেই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার চুক্তিটি করতে পারছে না। বাস্তবতা হল, মমতার পক্ষে তিস্তা চুক্তি করা দুরুহ। আঞ্চলিক রাজনীতি ও ভোট-ব্যাংকের হিসাব এখানে বড় বিষয়। এবারও পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় মমতা। নানা উছিলায় তিনি যে বিষয়টি এড়িয়ে যাবেন তাতে সন্দেহ নেই।

মমতা ক্ষমতায় আসায় বরং বাংলাদেশের দুশ্চিন্তা বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার কথা। আগামী কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় বছর খানেক ধরে থেমে থাকা জঙ্গিবাদ মাথা ছাড়া দিয়ে উঠবে। তাঁর রাজ্যের একাধিক আইএসের ঘাঁটি ও নাশকতার ছক জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএর হাতে। দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূলের সাংসদদের বড় একটি অংশ আবারও জঙ্গিদের সঙ্গে মোলাকাতে মেতে উঠবে। বাংলাদেশের উগ্রবাদ রাজনীতির কনসোর্টিয়াম-প্রধান জামায়াতের সঙ্গে তৃণমূলের দ্বিতীয় পর্যায়ের হানিমুন শুরু হয়ে যাবে।

এসব ধারণা একেবারে অমূলক নয়। ২০১১ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত যদি তৃণমূলের রাজনীতির বেপরোয়া মনোভাব পর্যবেক্ষণ করেন, তাহলে এটি বিশ্বাস করতেই হবে যে, তৃণমূলের ক্ষমতায় আসীন হওয়া বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির নয় দুশ্চিন্তার বিষয়।

ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, ২০১২ সাল থেকেই বাংলাদেশের মৌলবাদী গোষ্ঠীর আদর্শিক ছায়া জামায়াতে ইসলামীকে দেশের ভিতর অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য কয়েক মিলিয়ন ডলার দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। তৃণমূল সাংসদ আহমেদ হাসান ইমরানের মাধ্যমে অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান সারদার কেলেঙ্কারির টাকা জামায়াতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা হয়েছে।

বিষয়টি তদন্তের জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ফলে অভিযোগটি যে গুরুতর, তাতে সন্দেহ নেই। এসব বিষয় বন্ধুপ্রতীম ভারত এবং বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে খুবই সংবেদনশীল। তেমন গুরুতর না হলে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের এ নিয়ে মাথাব্যথা হওয়ার কথা নয়।

আহমেদ হাসান ইমরান ২০০১ সালে ভারতে নিষিদ্ধ মৌলবাদী সংগঠন ‘স্টুডেন্টস ইসলামিক মুভমেন্ট অফ ইন্ডিয়া’এর (সিমি) পশ্চিমবঙ্গ শাখার সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক মনে করে, সময়ের পরিক্রমায় সিমি বহুগুণে শক্তিশালী হয়ে ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। সিমির প্রাক্তন অনেক নেতারা এখন তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নিজস্ব গোয়েন্দা বিভাগও ইমরানের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে একই ধরনের রিপোর্ট করেছিল। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার নলিয়াখালিতে জঙ্গি-গোষ্ঠীর সংঘর্ষের ঘটনায় ইমরানের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়। রিপোর্টটি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে দেওয়ার পরও কেন মনোনয়ন দিয়ে দুবার ইমরানকে রাজ্যসভায় নিয়ে আসা হল, সে প্রশ্নের উত্তর একমাত্র তিনিই দিতে পারবেন।

প্রসঙ্গত, মমতার বাংলাদেশ সফরের সময় ইমরানের নাম তাঁর সফরসঙ্গীদের তালিকায় থাকলেও বাংলাদেশে জঙ্গি-মদদের অভিযোগ থাকায় তিনি তাকে নিয়ে আসতে পারেনি।

মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত গোলাম আযমের ছেলে মামুন-আল আযমের সঙ্গে ইমরানের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। ইমরান ভারতের জামায়াতে ইসলামী, হিন্দের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন বেশ কয়েক বছর। আল-আজম আইডিবি ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর থাকা অবস্থায় ভারতের পূর্বাঞ্চলে ব্যাংকটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন ইমরান। সেই থেকে ইমরান আর আল-আজমের মধ্যে সুসম্পর্ক।

যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসি হওয়ায় কলকাতার ধর্মতলায় কিছু ইসলামিক সংগঠন প্রতিবাদ মিছিল করেছিল। পরবর্তীতে জানা যায়, বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী এবং সিমির মদদেই মিছিলগুলি অনুষ্ঠিত হয়। আহমেদ হাসান ইমরান এসব মিছিলে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা কেন্দ্রীয় সরকারকে তা নিশ্চিত করেছে।

তৃণমূলের আরেক সদস্য মুনমুন সেন ও পাকিস্তানের তেহরিক-ই-ইনসাফ নেতা ইমরান খানের মধ্যে এখনও নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে বলে ভারতীয় কেন্দ্রীয় গোয়েন্দার সংস্থার দাবি। মুনমুন পাকিস্তানের আইএসআইএর সঙ্গে সরাসরি জড়িত, সে সন্দেহও রয়েছে কিছু কিছু মহলের। গোয়েন্দারা বলছে, ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের প্রমাণ তাদের হাতে রয়েছে।

২০১৩-২০১৪ সালে ভারতের গোয়েন্দারা যে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য মরিয়া ছিলেন সেটি হল, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেসব জানতেন কি না।’ তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের উগ্র গোষ্ঠীর মধ্যকার নিবিড় যোগাযোগ মুখ্যমন্ত্রী মমতার গোচেরই হয়েছিল বলে মনে হয়। যদিও তাঁর দল অস্বীকার করেছিল সেটি। বলেছিল, এটি বিজেপির রাজনীতি।

কিন্তু তাদের দাবি তেমন গ্রহণযোগ্য মনে হয় না। সারদার মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীর কাছ থেকে টাকা দেওয়া-নেওয়া ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি বিশ্বাসযোগ্য ঘটনা তাই প্রমাণ করে।

প্রথমত, সেই সময়টিতে পাকিস্তানি হাইকমিশনারের কলকাতা সফর ছিল উল্লেখযোগ্য ঘটনা। মমতার সঙ্গে হাইকমিশনারের সাক্ষাতের পিছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিলেন মুনমুন সেন ও ইমরান খান। ভারতের চিরবৈরি পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেশটির একজন মুখ্যমন্ত্রীর দেখা হতেই পারে। কিন্তু সে সাক্ষাত যখন আইএসআইপন্থী পাকিস্তানি রাজনীতিবিদ এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুর আগ্রহে অনুষ্ঠিত হয়, তখন এর পিছনের উদ্দেশ্য বেশ পরিষ্কার হয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত, সাক্ষাতের পরপরই কলকাতার একটি সাংবাদিক দলকে পাকিস্তানে সফরের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তেমন প্যারা-ডিপ্লোম্যাসি স্থান পায় না। কেন্দ্রকে আড়ালে রেখে পাকিস্তানের সঙ্গে স্বপ্রণোদিত হয়ে প্যারা-ডিপ্লোম্যাসি চালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে অন্যান্য পাকিস্তানপ্রেমী কর্মকাণ্ড মিলে যায়। খোদ পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ জনগণই বিশ্বাস করে যে, মমতা সরকারের বেশ কিছু পদক্ষেপে এই অঞ্চলের উগ্রপন্থীদের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হচ্ছে।

তৃতীয়ত, কলকাতায় পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনারের কাছে রাজ্যের মুসলিমদের জন্য পাকিস্তানের ভিসা-প্রক্রিয়া সহজতর করার অনুরোধের অভিযোগও ছিল মমতার বিরুদ্ধে। ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও মুসলিম জনগোষ্ঠী রয়েছেন। সেসব প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীরা এমন ধারা অনুরোধ করেননি। মমতা যদি সারা ভারতের মুসলিমদের জন্য ভিসা-পদ্ধতি সহজ করার কথা বলতেন তাতে কারও তেমন কিছু বলার থাকত না।

চতুর্থত, উর্দুভাষী মানুষের আনাগোনা কলকাতায় উল্লেখ্যযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে, যা সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সাধারণ মানুষের ধারণা, মমতার উগ্র রাজনীতিপ্রীতির জন্যই রাজ্যের ভিতর অন্য দেশের মানুষদের আনাগোনা বেড়ে গিয়েছে।

তৃণমূলের সদস্য মুনমুন সেন ও পাকিস্তানের তেহরিক-ই-ইনসাফ নেতা ইমরান খানের মধ্যে যোগাযোগ রয়েছে বলে ভারতীয় কেন্দ্রীয় গোয়েন্দার সংস্থার দাবি

পশ্চিমবঙ্গ আমাদের প্রতিবেশি হওয়ায় মমতার এই ধরনের কর্মকাণ্ডে আমরাও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হই বৈকি। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ এবং ভারতের সীমান্তে গরু চোরাচালান ও মাদক ব্যবসায় সারদার কেলেঙ্কারির টাকার একটি বিরাট অংশ বিনিয়োগ করা হয়েছে। বিনিয়োগের লভ্যাংশ বাংলাদেশের ভিতর অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য ব্যয় করা হচ্ছে বলেও ধারণা। উদ্দেশ্য, শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাত করা।

গোয়েন্দা তথ্যে আরও জানা যায়, ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যসভার নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়েছিল। গোয়েন্দারা এ ব্যাপারে নিশ্চিত বলা যায়। সারদা কেলেঙ্কারির অন্যতম মূল অভিযুক্ত কুনাল ঘোষ অর্থের আদান-প্রদান বিষয়ে মুখ খুলতে চাইছিলেন। কিন্তু মমতা সরকারের নির্দেশে গঠিত কল্যাণ কমিশন ঘোষকে এড়িয়ে গিয়েছিল। কুনাল নিজে থেকেই কমিশনের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য অনুরোধ জানিয়ে আসছিলেন। কুনালকে মুখ খুলতে দিলে বহু তথ্যই বের হয়ে আসত।

২০১১ সালের বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান-অধ্যুষিত এলাকায় বাংলাদেশের জামায়াতের নেতা-কর্মীরা তৃণমূলের পক্ষে কাজ করেছিলেন। এবারের নির্বাচনেও অনেক বাংলাদেশি পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের পক্ষে নির্বাচনে কাজ করেছেন। বিশেষ করে মালদা, দক্ষিণ এবং উত্তর দিনাজপুর, মুর্শিদাবাদ জেলাসহ বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে জামায়াতের কর্মীরা তৃণমূলের পক্ষে গণসংযোগ করেন।

ভারতের জাতীয়, আঞ্চলিক এবং স্থানীয় নির্বাচনে সংখ্যালঘু ভোট ব্যাংকটির ইলেকটরাল আচরণ পর্যালোচনা করলে মমতার বিতর্কিত রাজনৈতিক পদক্ষেপগুলির কারণ বুঝা যায়।

ঐতিহাসিকভাবে ভারত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা (বাংলাদেশের মতো সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস হয় না সেখানে) প্রবল। বিশেষ করে সিপিএম ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে দাঙ্গা প্রায়ই হত এবং সংখ্যালঘু মুসলমানরা নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাতেন। সিপিএম ক্ষমতায় আসার পর তেমন দাঙ্গা হয়নি। ফলে সংখ্যালঘু ২৭ শতাংশ ভোট সিপিএমের কোষাগারে যায়। সিপিএম মুসলমানদের মধ্যে ভূমি বিতরণ করেও সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জন করে।

এই সাদৃশ্য দেখা যায় বিহারে। ১৯৯০ সালে লালু প্রসাদ যাদব ক্ষমতায় আসার পর সেখানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি। দীর্ঘ ১৫ বছর সংখ্যালঘু ভোট ব্যাংকটি ব্যবহার করে লালু ক্ষমতায় থাকেন। একই পদ্ধতিতে উত্তর প্রদেশে মুলায়েম সিং যাদব ক্ষমতায় আসেন।

এখন নিরাপত্তা ইস্যুটি সংখ্যালঘু মুসলমানদের অগ্রাধিকার তালিকাতে নেই। তাদের সচেতনতা বেড়েছে। তারা শিক্ষা, চাকরি ও দারিদ্র দূরকে অগ্রাধিকার তালিকায় নিয়ে এসেছেন। সেসব ইস্যুতে গুরুত্ব না দেওয়ার জন্য লালু প্রসাদ যাদবের ক্ষমতা চলে গিয়েছিল নিতিশের হাতে। ঠিক একই কারণে মুলায়েম সিং ইউপিতে মায়াবতীর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন।

পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু মুসলমানরাও আগের মতো নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত নন। সিপিএমের জমানায় সরকারি চাকরিসহ অন্যান্য আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে পিছিয়ে থাকার কারণেই বামফ্রন্টের উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেন ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা। যেখানে সারা ভারতে স্বাক্ষরতার হার ৬৫ শতাংশ, সেখানে পশ্চিমবঙ্গের ২৮ শতাংশ ভোটের মালিক সংখ্যালঘু মুসলিমদের শিক্ষার হার ৫৭.৫।

এর বিপরীতে, বাম-শাসিত কেরালায় সংখ্যালঘুদের স্বাক্ষরতার হার ৮৯.৪ শতাংশ। একটি গবেষণায় দেখা যায়, কেরালায় মুসলিমদের দারিদ্রের হার ১৫ বছরে (১৯৮৭-২০০৪) ৫৬ থেকে ৩১ শতাংশে নেমে এলেও, পশ্চিমবঙ্গে তা ৫৩ শতাংশ থেকে ৪৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে মাত্র।

মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতি অবহেলার কারণেই সিপিএম ২০১১ সালে ক্ষমতা হারায়। মমতা ২৯৪ আসনের মধ্যে ১৮৪ আসন পেয়ে রাজ্যের ক্ষমতায় যান। এবারের নির্বাচনেও মমতার জোড়া ফুল ২১১ আসনে জয়লাভ করেছে। রাজ্যসভার মতো লোকসভার নির্বাচনেও সিপিএমের শোচনীয় পরাজয় হয়। পশ্চিমবঙ্গের ৪২ টি আসনের মধ্যে ২০টিতে জয়নির্ধারণী ভোটের মালিক ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা।

পাশাপাশি, মমতার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও ব্যক্তিগত আচার-আচরণ নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করলে অসহনশীলতা, নীতিহীনতা, রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতার উপস্থিতি প্রবলভাবেই পাওয়া যায়।

জীবনের প্রারম্ভিক পর্যায়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি শুরু করলেও, কংগ্রেসের রাজনীতি দিয়েই মমতার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু। ১৯৮৪ সালে বর্ষীয়ান কমিউনিস্ট নেতা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে পরাজিত করে সাংসদ নির্বাচিত হয়ে জাতীয় পর্যায়ে সাড়া ফেলে দেন তিনি। এরপর সারা ভারতের যুব কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদকও নির্বাচিত হন।

১৯৯১ সালে লোকসভায় আবার নির্বাচিত হয়ে নরসিমা রাওয়ের মন্ত্রিসভায় মমতা মানব সম্পদ ও ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে স্থান পান। পরে কলকাতায় ক্রীড়া উন্নয়নের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের উদাসীনতার অভিযোগ এনে মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেন। ১৯৯৬ সালের দিকে নিজ দল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সিপিএমকে সহযোগিতার অভিযোগ আনেন এবং পরিচ্ছন্ন কংগ্রেসের দাবি জানিয়ে প্রকাশে জনসভায় শাল পেঁচিয়ে আত্মহত্যার হুমকি দেন।

১৯৯৬ সালে পেট্রোলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে মমতা সমাজবাদী পার্টির নেতা অমর সিংহের জামার কলার ধরে টানা-হেঁচড়া করেন। রেলের প্রতি অবহেলার অভিযোগে ১৯৯৭ সালে সংসদে তৎকালীন রেলমন্ত্রী রাম বিলাসের দিকে নিজের শাল ছুঁড়ে মারেন। ১৯৯৮ সালে লোকসভায় মহিলা সংরক্ষণ বিলের বিরোধিতা করতে গিয়ে সমাজবাদী পার্টির সাংসদ দারোগা প্রসাদ সরোজকে জামার কলার ধরে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে আসেন।

১৯৯৭ সালে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন তিনি। দলটি খুব অল্প সময়ে বামফ্রন্টের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

তৃণমূল ১৯৯৯ সালে বিজেপির নেতৃত্বে সরকারে সামিল হলে রেলের দায়িত্ব পান মমতা। রাজনৈতিক মতানৈক্যের কারণে তৃণমূল পরে সরকার থেকে বের হয়ে যায়। ২০০১ সালের শেষের দিকে বিধানসভা নির্বাচনের আগে মমতা কংগ্রেসের সঙ্গে নির্বাচনী জোট করেন। তারপরও নির্বাচনে বামফ্রন্ট জয়লাভ করে। ২০০৬ সালের বিধানসভার নির্বাচনেও বড়সড় বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে মমতার তৃণমূল।

২০০৪ সালে তিনি আবার ফিরে যান বিজেপির কোয়ালিশন সরকারে। তখন কয়লা ও খনির দায়িত্বে ছিলেন তিনি। এটি হিন্দুত্ববাদী বিজেপির সঙ্গে মমতার শেষ কোয়ালিশন। কারণ বর্তমান ভোটের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিজেপির সঙ্গে জোট করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।

২০০৬ সালে সিপিএম সরকারের শিল্পনীতির বিরোধিতা এবং ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম গণহত্যার প্রতিবাদের ফলে মমতার জনপ্রিয়তা অনেক বেড়ে যায়। কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের একটি বৃহৎ অংশ বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে চলে যায়। তাদের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে।

২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ৪২ আসনের মধ্যে ১৯টিতে জয় পায় তৃণমূল। মমতা কংগ্রেস-নেতৃত্বের সরকারে আবারও রেলের দায়িত্ব পান। ২০১১ সালের বিধানসভার নির্বাচনে ৩৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা সিপিএমকে হারিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসে। অভিযোগ ছিল, সারদা ১৩০ কোটি টাকা তৃণমূলের নির্বাচনে অর্থায়ন করেছিল, যার বড় অংশ বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী দিয়েছে।

সংখ্যালঘুদের ভোট-ব্যাংক মমতার ক্ষমতার প্রাণশক্তি। প্রতিটি নির্বাচনের আগে জামে মসজিদ শাহীর ইমাম বুখারী এবং টিপু সুলতান মসজিদের ইমাম বারখাতি তৃণমূলের পক্ষে ভোট দেওয়ার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে তাদের ভোট দেওয়ার জন্য মুসলিমদের প্রতি আহবান জানান।

মমতার মতো পোড়-খাওয়া রাজনীতিবিদ জানেন কেন লালু প্রসাদ যাদবকে সরিয়ে নিতিশ এবং মুলায়েম সিংকে সরিয়ে মায়াবতী ক্ষমতায় এলেন। এমনকি খোদ পশ্চিমবঙ্গেও কংগ্রেসের কাছ থেকে সিপিএম এবং সিপিএমের কাজ থেকে নিজের দল তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় এবং লোকসভায় শক্তিশালী বিরোধী দল। গত লোকসভার সংসদে তৃণমূল কংগ্রেস দ্বিতীয় বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা পালন করে।

মমতা এমন কিছু করতে চাইবেন না যাতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা তাঁর বিপক্ষে চলে যায়। ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পরই ত্রিশ হাজার ইমামকে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ভাতা প্রদান হাইকোর্ট দ্বারা অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হলেও মমতার প্রতি সংখ্যালঘুদের বিশ্বাস বেড়ে যায়। তিস্তা পানি চুক্তি না করার পিছনেও অন্যতম কারণ হল, তিস্তার তীরে বসবাসকারী মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশই ধর্মীয় সংখ্যালঘু। মমতা জানেন, ভারতের সংখ্যালঘু ভোট ব্যাংকটি কোনো দলের জন্য নির্দিষ্ট নয়। আগে ভারতে প্রোগ্রেসিভ অল্টারনেটিভ তেমন ছিল না, এখন অনেক আছে।

তিনি নিজেও জানেন, ইমরানের মতো সিমির অনেক প্রাক্তন নেতার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কী। সংখ্যালঘু ভোট ব্যাংকটি ব্যবহার করে সিমির নেতারা ভারতের ভিতরে ও বাইরে ভারতের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত, খোদ পশ্চিমবঙ্গের সরকারের গোয়েন্দারাই তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেন।

সারদা কেলেঙ্কারিতে তাঁর নিজ দলের জঙ্গি-বান্ধব রাজনীতিবিদ আহমেদ হাসান ইমরান থেকে শুরু করে মুনমুন সেনের মতো অনেক সেলিব্রেটি জড়িত। যদি ইমরানের মাধ্যমে বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর টাকা নিয়ে ২০১১ সালের বিধানসভা ও ২০১৪ সালের লোকসভার নির্বাচন করা যায়, প্রশ্ন থেকে যায় কোন নৈতিক ক্ষমতার জোরে মমতা সারদার টাকা জামায়াতের প্রয়োজনে দিতে আপত্তি করবেন?

অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, দেশের ভিতর জঙ্গি উত্থান ঘটল কি না, তা মমতার কাছে মুখ্য নয়। মুখ্য হল সংখ্যালঘু ভোটের কিছু সুবিধাবাদী প্রতিনিধিকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় থাকা। এ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা আর বাংলাদেশ অনেক দূরের বিষয়। তিনি এমন এক রাজনীতিবিদ, যার কাছে নিজ দলের স্বার্থই প্রাধান্য পায়। নিজের স্বার্থের জন্য প্রথমে বিজেপি, পরে কংগ্রেস, আবার বিজেপি, আবার কংগ্রেস জোটে গিয়েছেন তিনি। গত লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি থেকে কোয়ালিশনের জন্য ইঙ্গিত দিলেও মমতার সাড়া পাওয়া যায়নি। বিজেপির পক্ষে গিয়ে সংখ্যালঘু ভোট ব্যাংকটি হারাতে হতে পারে এই ভয়ে সেখানে সাড়া দেননি তিনি।

এখন দেখার বিষয়, এহেন মমতার হাতে কতটা নিরাপদ এ অঞ্চলের রাজনীতি।

লেখক: বিজন সরকারভাষা গবেষক; রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
সূত্র:

Print Friendly, PDF & Email
basic-bank

Be the first to comment on "আবারও কি মদদ জঙ্গিবান্ধব রাজনীতিতে"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*