নিউজ ডেস্ক: কাউন্সিলের প্রায় সাড়ে চার মাস পর শনিবার দুপুরে বিএনপির কমিটি ঘোষণা করা হলেও কাঙ্ক্ষিত পদ না পাওয়ায় অনেক নেতা পদত্যাগের ঘোষণা দিচ্ছেন বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। কমিটিতে অনেকের আবার অবনমন হওয়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্ করা গেছে।
এদিকে কমিটি ঘোষণার পর দু-একজন ইতোমধ্যে কমিটি থেকে নাম প্রত্যাহার চেয়ে আবেদনও করেছেন। পদত্যাগ চেয়ে আরো কয়েকজন আবেদন করতে পারেন বলে সূত্রে জানা গেছে।
আবার পরিস্থিতি বিবেচনায় অনেকে পদত্যাগ না করলেও তারা আর সেভাবে রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন না এটা মোটামুটি নিশ্চিত। বিএনপি সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।
শনিবার দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেন।
একইসঙ্গে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির ১৭ সদস্যের নাম ও ৭৩ সদস্যের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিল ঘোষিত হয়েছে।
চলতি বছরের ১৯ মার্চ রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন প্রাঙ্গণে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়।
কমিটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ঘোষিত কমিটিতে অনেকের পদোন্নতি হয়েছে, অনেকে আবার একইপদে বহাল রয়েছেন। তবে অবনমনও (ডিমোশন) হয়েছে অনেকের। অবনমনের জন্য বিএনপির বিগত আন্দোলনে নিষ্ক্রিয়তা, দলে বিতর্কিত ভূমিকা ও কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে দায়ী করা হচ্ছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঘোষিত কমিটিতে ন্যূনতম সাতজনের অবনমন ঘটেছে। তারা হলেন- বেগম সারোয়ারি রহমান, নাদিম মোস্তফা, নাজিমউদ্দিন আলম, ডা. কাজী মাজহারুল ইসলাম দোলন, আব্দুল লতিফ জনি, কৃষিবিদ শামীমুর রহমান শামীম ও আসাদুল করিম শাহীন।
সারোয়ারি রহমান বিদায়ী স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতার কারণে সাংগঠনিক কাজে অংশ নিতে না পারায় তাকে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদে রাখা হয়েছে।
বিদায়ী কমিটিতে নাদিম মোস্তফা বিশেষ সম্পাদকের দায়িত্বে থাকলেও নতুন কমিটিতে তাকে নির্বাহী সদস্য করা হয়েছে। যদিও তিনি ভাইস চেয়ারম্যান পদের আলোচনায় ছিলেন। ইতোমধ্যে নাদিম মোস্তফা পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এমন গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে।
নাজিমউদ্দিন আলম বিদায়ী কমিটিতে আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। নতুন কমিটিতে তাকে নির্বাহী সদস্য করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিএনপির সরকারবিরোধী বিগত আন্দোলনে চরম নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ রয়েছে। তিনি নতুন কমিটিতে যুগ্ম সম্পাদক কিংবা আরো বড় পদের প্রত্যাশী ছিলেন।
জানতে চাইলে নাজিমউদ্দিন আলম বলেন, ‘আমি দলের জন্য কাজ করেছি, এখনো করছি, ভবিষ্যতেও করব। কমিটিতে ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) আমাকে যেখানে উপযুক্ত মনে করেছেন সেখানেই রেখেছেন। এ নিয়ে আমার কোনো ক্ষোভ নেই। আমাকে নির্বাহী সদস্য পদ দিয়ে ম্যাডাম খুশি থাকলে আমিও খুশি। আমি শুধু বিএনপির জন্য কাজ করে যেতে চাই।’
ডা. কাজী মাজহারুল ইসলাম দোলন বিদায়ী কমিটির স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। তাকেও নির্বাহী কমিটির সদস্য করা হয়েছে।
জানা যায়, বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক থাকলেও বিগত কমিটির পর থেকেই সে সম্পর্ক ক্রমেই তিক্ত হতে থাকে। একপর্যায়ে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এছাড়া দলে তার বিতর্কিত ভূমিকা আছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বিদায়ী কমিটির সহ-দফতর সম্পাদক আব্দুল লতিফ জনি নতুন কমিটির নির্বাহী সদস্য হয়েছেন। যদিও দফতর সম্পাদকের আলোচনায় তার নাম শোনা গেছে। তিনি কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রাজনীতির শিকার বলে অনেকে মত দিয়েছেন। বিশেষ করে তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ একজনের রোষানলের শিকার বলে জানা যায়। তবে মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় এ বিষয়ে তার মতামত জানা সম্ভব হয়নি।
কৃষিবিদ শামীমুর রহমান শামীম বিগত কমিটির সহ-দফতর সম্পাদক। নতুন কমিটিতে তাকে সহ-প্রচার সম্পাদক করা হয়েছে। কিন্তু তিনি প্রচার সম্পাদকের আলোচনায় ছিলেন। তাই সদ্য ঘোষিত কমিটির সহ-প্রচার সম্পাদক পদ থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার চেয়েছেন শামীমুর রহমান শামীম।
জানতে চাইলে হতাশার সুরে তিনি বলেন, ‘রাজনীতি করতে গিয়ে আমি পাঁচ মাস কারাগারে ছিলাম। অসংখ্য মামলায় জর্জরিত। আন্দোলনের সময় দায়িত্ব পালন করেছি। কিন্তু নতুন কমিটিতে আমাকে মূল্যায়ন করা হয়নি। আগে আমি সহ-দফতর সম্পাদক ছিলাম। এখন আমাকে ডিমোশন দিয়ে ৩ নং সহ-প্রচার সম্পাদক করা হয়েছে। আমার প্রতি চরম অবিচার করা হয়েছে। সেজন্য কমিটি থেকে নাম প্রত্যাহার চেয়ে মহাসচিব বরাবর চিঠি দিয়েছি।’
বিদায়ী কমিটির সহ-দফতর সম্পাদক আসাদুল করিম শাহীনকে নতুন কমিটিতে সহ-প্রচার সম্পাদক করা হয়েছে। তিনি পূর্বের পদে বহাল থাকা কিংবা কোনো সম্পাদকীয় পদের প্রত্যাশী ছিলেন বলে তার ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা যায়।
এছাড়া বিদায়ী কমিটির যুগ্ম মহাসচিব আমানউল্লাহ আমান ও মিজানুর রহমান মিনুকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদে নেয়া হয়েছে। তারা ভাইস চেয়ারম্যান পদের আলোচনায় ছিলেন। বিদায়ী কমিটির অর্থনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা মহানগরের সাবেক সদস্য সচিব আব্দুস সালামকেও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা করা হয়েছে। ভাইস চেয়ারম্যানের আলোচনায় তার নামও ছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক নেতা বলেন, এই নেতারা বিএনপির সরকারবিরোধী বিগত আন্দোলনে চরম নিষ্ক্রিয়তার পরিচয় দিয়েছেন। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, শুধু এরা নয়, বিএনপির বিদায়ী কমিটির কেন্দ্রীয় নেতাদের অধিকাংশই নিষ্ক্রিয় ছিলেন। কিন্তু দেখা গেছে, নতুন কমিটিতে তারা ভালো পদে গেছেন। সেদিক থেকে বলতে গেলে এদের প্রতি অবিচার করা হয়েছে।
এই সাতজনের অবনমনের জন্য কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেও দায়ী করছেন বিএনপির আরেক নেতা। তার মতে, ‘কমিটি গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা জড়িত এই সাতজন তাদের আক্রোশের শিকার হয়েছেন। বলতে গেলে, আন্দোলনে বিগত কমিটির অধিকাংশ নেতাই নিষ্ক্রিয় ছিলেন। খালেদা জিয়া আন্দোলনের ডাক দিলেও ঢাকার রাজপথে কোনো নেতাকেই দেখা যায়নি। তাহলে শুধু এরা কেন বলি হবেন?’
এদিকে পদপ্রাপ্তির সাড়ে চার ঘণ্টার মাথায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন মোসাদ্দেক আলী ফালু। বিদায়ী কমিটিতে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ছিলেন তিনি।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বরাবর লেখা এ পদত্যাগপত্রটি শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে দলের নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পৌঁছে দেয়া হয়েছে।
পদত্যাগপত্রে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান পদে মনোনীত করায় খালেদা জিয়ার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ফালু লেখেন, ‘সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও শারীরিক কারণে আমার পক্ষে ওই পদে থাকা সম্ভব হচ্ছে না। তাই নতুন কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ পদত্যাগপত্রটি গ্রহণ করে ভাইস চেয়ারম্যানের পদ থেকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন মোসাদ্দেক আলী ফালু।

Be the first to comment on "কাঙ্ক্ষিত পদ না পাওয়ায় দীর্ঘ হচ্ছে পদত্যাগের লাইন"