মনোবল না হারানোর পরামর্শ দিতেন শেখ হাসিনা

নিউজ ডেস্ক: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে গ্রেফতার হওয়ার আগে ও পরে নেতাকর্মীদের সব সময় মনোবল ধরে রাখার পরামর্শ দিতেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলতেন, ‘মনোবল হারানোর কিছু নেই, তারা (তত্ত্বাবধায়ক সরকার) আমাকে কিছুই করতে পারবে না।’

শনিবার (১৬ জুলাই) শেখ হাসিনার কারাবন্দি দিবস উপলক্ষে জাগো নিউজের সঙ্গে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কথাগুলো বলছিলেন ওই সময়ের প্রত্যক্ষদর্শী আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী।

২০০৭ সালে ১৬ জুলাই তৎকালীন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায় সরকার আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতার করার পর একাধিক বার আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো তাকে। আদালতে দেখা করতে গেলে দলের নেতাকর্মীদের এই কথাই বলতেন তিনি।

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ২০০৭ সালের ১৫ জুলাই বিকেল থেকে আমরা ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধু ভবনে ছিলাম। পরে রাত ১১টার দিকে শেখ হাসিনা সুধাসদনে ফিরে আসেন। পরে আমাকে সুধাসদনে ডেকে পাঠানো হয়। আমরা ৩২ এ থাকা অবস্থায় জানতে পারলাম শাহবাগের আসপাশের এলাকায় অনেক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

‘ওই রাতে নেত্রী (শেখ হাসিনা) আমাকে বললেন, তারা (সরকার) ভাবছে আমাকে গ্রেফতার না করলে তাদের উদ্দেশ্য সফল হবে না।’

শেখ হাসিনা তখন রাতের খাবার খাচ্ছিলেন। খাবার শেষ হওয়ার পর তিনি আমাকে বললেন, ‘তোমার আর থাকার দরকার নেই। তুমি চলে যাও। ওই সময় আমাকে কিছু দিক নির্দেশনাও দিয়েছিলেন।’

রাত সাড়ে ১২টার দিকে আমি তার (শেখ হাসিনা) কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসায় চলে আসি। বাসায় পৌঁছানোর পর এক সংবাদ কর্মী ফোন করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভাই আপনি কোথায়? আমি বললাম এখন বাসায়।’

তখন তিনি বললেন, আপনি এখনই বাসা থেকে বেরিয়ে চলে যান। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে? তুমি কোথায়? তিনি (সংবাদ কর্মী) বললেন, ‘আপনাদের হয়তো টার্গেট করা হয়েছে। গ্রেফতার করা হবে।’

ওই সংবাদ কর্মী নিজে মটর সাইকেল নিয়ে আমার বাসায় আসে। আমি তার মটর সাইকেলে করে ধানমন্ডি ১৫ নম্বরে আমার এক ছোট ভাইয়ের বাসায় গেলাম।

রাতে হঠাৎ চরম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। বৃষ্টির মধ্যে সুধাসদন ঘেরাও করে রেখেছিলো পুলিশ। তবে সুধাসদনে যারা ছিলো তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হচ্ছিলো।

ভোরের দিকে আমরা সুধাসদনে গেলাম। তখন আমাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা তারেক আহমেদ সিদ্দিকী, মেজর সোয়েব ও স্কোয়াডন লিডার মামুন গিয়েছিলেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাউকেই ঢুকতে দেয়নি।

ভোর সাড়ে ৭টার দিকে শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় তারা (আইনশৃঙ্খলা বাহিনী)। তাকে (শেখ হাসিনা) ঠিক কোন গাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো আমরা বুঝতে পারলাম না। আমরা ধারণা করলাম তাকে কোর্টে নিয়ে যাওয়া হতে পারে। তখন আমরা আমাদের আইনজীবী নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কোর্টে গিয়ে জামিন আবেদন করতে বললাম।

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মহানগর ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতাদের সংগঠিত করলাম। যদি শেখ হাসিনাকে জামিন না দেওয়া হয় তাহলে আমরা বড় ধরণের জনসমাগম করবো। কোর্ট শেখ হাসিনাকে জামিন দেননি। তাকে সাব জেলে নিয়ে যাওয়া হয়।

সাব জেলে তার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। কিন্তু কেউ দেখা করতে পারলাম না। ওইখানে অনেক সাংবাদিক ছিলো। তখন আওয়ামী লীগের পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ দলের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।

তিনি বলেন, তারেক আহমেদ সিদ্দিকী, মেজর সোয়েব, স্কয়াড্রন লিডার মামুনের সঙ্গে আলোচনা করলাম কি করা যায়। উনারা আমাদের বললেন, সরকার যেভাবে এগুচ্ছে জনসমাগম বা জনসম্পৃক্ততামূলক কর্মসূচি দিতে না পারলে তারা (সরকার) পিছু হটবে না।

সেনাবাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়ামে ক্যাম্প করেছিলো। আমরা তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগকে আন্দোলনের দায়িত্ব দিলাম। ওইখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সহযোগিতা করেছিলেন। তবে পুরো প্ল্যানটা সবাই জানতো না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সঙ্গে সেনা সদস্যদের বিরোধের ঘটনা ঘটেছিলো। ওই সময় বাংলাদেশের বড় বড় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলাম। যাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সঙ্গে সেনা বাহিনীর ঘটনায় কোনো কর্মসূচি দেওয়া হয়। কিন্তু কেউ দেননি।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শুধুমাত্র বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই তখন কারাগার থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ওই সময় আমি প্রায় ২০ থেকে ২৫ দিন আত্মগোপনে ছিলাম। শেখ হাসিনার চিকিৎসক ও পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে আমরা খোঁজ-খবর পেতাম।

পুলিশ যখন সুধাসদন ঘেরাও করে রেখেছিলো তখন আওয়ামী লীগ সভাপতি জাতির উদ্দেশ্যে একটা চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিটা তার (শেখ হাসিনা) স্টাফ জাহাঙ্গীরের কাছে ছিল। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সবাইকে তল্লাশি করে। কিন্তু চিঠিটা কার্পেটের নিচে রেখে দেওয়া হয়েছিল।

পরে বেবী মওদুদ চিঠিটা এনে শেখ হাসিনার প্রেস সেক্রেটারি আবুল কালাম আজাদকে দিয়েছিলেন পত্রিকায় ছাপানোর জন্য। কিন্তু তখন পত্রিকায় ছাপানোর সুযোগ ছিলো না। পরে আমরা চিঠিটা ফটোকপি করে সবাইকে প্রচার করি। অনেক ঘটনাই ঘটেছিলো সংক্ষেপে বলা যাবে না।  যোগ করেন তিনি।

গ্রেফতার হওয়ার সময় শেখ হাসিনার লেখা চিঠি :

প্রিয় দেশবাসী,
আমার সালাম নিবেন। আমাকে সরকার গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে। কোথায় তা জানি না। আমি আপনাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যেই সারাজীবন সংগ্রাম করেছি। জীবনে কোনো অন্যায় করিনি। তারপরও মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। উপরে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ও আপনারা দেশবাসী আপনাদের উপর আমার ভরসা।

আমার প্রিয় দেশবাসী, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের কাছে আবেদন কখনও মনোবল হারাবেন না। অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন। যে যেভাবে আছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুক্ষে দাঁড়াবেন। মাথা নত করবেন না। সত্যের জয় হবেই। আমি আছি আপনাদের সঙ্গে, আমৃত্যু থাকব। আমার ভাগ্যে যা-ই ঘটুক না কেন আপনারা বাংলার জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যান। জয় জনগণের হবেই।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়বই। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবই।
জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু।

শেখ হাসিনা।
১৬/০৭/২০০৭

সূত্র: জাগো নিউজ

Print Friendly, PDF & Email
basic-bank

Be the first to comment on "মনোবল না হারানোর পরামর্শ দিতেন শেখ হাসিনা"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*