লোহাগড়ায় টিআর প্রকল্পের অর্থ নয়ছয়!

লোহাগড়ায় টিআর প্রকল্পের অর্থ নয়ছয়!

নিউজ ডেস্ক : নড়াইলের লোহাগড়ায় টিআর প্রকল্পের অধিনে গ্রামীণ জনপদে ৮৬ টি প্রকল্প বাস্তবায়নে অধিকাংশ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে । ২০২১-২২ অর্থ-বছরে এ উপজেলার রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো রক্ষনাবেক্ষণ ও সংস্কার ২য় পর্যায়ে এমপি’র বরাদ্দকৃত টিআর প্রকল্পে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো: ইসরাফিল হোসেনের যোগসাজসে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে ।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সুত্রে জানা যায়, লোহাগড়ায় ১২টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় টিআর ২য় পর্যায়ে ৮৬টি প্রকল্পের বিপরীতে ৭২ লক্ষ ৭৫ হাজার ৩’শ ৩৩ টাকা বরাদ্ধ দেওয়া হয়। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে যথাযথ তদারকি না থাকায় বেশীর ভাগ প্রকল্পেই নয়-ছয় করে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন করে তা আত্মসাত করা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায় ,উপজেলার দিঘলিয়া ইউনিয়নের বাগডাঙ্গা তিলাপের মাঠ থেকে পশ্চিম দিক বিল অভিমুখী রাস্তা ইটের ফ্লাট সলিং কাজের বিপরীতে ২ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। বাস্তবে সেখানে একখান ইটও বসানো হয়নি। তিলাপের মাঠের পাশের মুদি দোকানি আমিনুর রহমান ও কৃষক বাবুল মোল্যা অভিযোগ করে বলেন, এই রাস্তার সামনে তালবাড়িয়া বিল। এই বিলে হাজার হাজার একর জমিতে কয়েক’শ কৃষকের মাছের ঘের ও তাদের ফসলি জমি রয়েছে। মাছের খাবার নেওয়া ও মাছ এবং ফসল আনার জন্য এই একটি মাত্র রাস্তা। রাস্তাটি কাঁচা থাকায় বর্ষাকালে চলাচলের জন্য সর্ম্পুন্য অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বর্ষাকালে এলাকার মানুষের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। রাস্তাটিতে প্রায় ৫-৬ বছর আগে তিলাপের মাঠ পর্যন্ত ইট বসানো হলেও এরপর এ রাস্তায় কোন কাজ হয়নি। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি (পিআইসি) তালবাড়িয়া গ্রামের জুলফিকার সরদারের ছেলে আরমান সরদার বলেন, প্রকল্পের শতভাগ টাকা উত্তোলন করা হলেও রাস্তায় কাঁদা থাকায় কাজ করা যায় নাই, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে কাজ করে দিবো।
নলদী ইউনিয়নের মতিননগর সুখী বিশ্বাসের বাড়ি হইতে ইছামতি বিল অভিমুখী রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পে ৩ লাখ টাকা বরাদ্ধ দেয়। মতিননগরে শতাধিক সংখালঘু সম্প্রদায়ের পরিবার বসবাস করেন। এ গ্রামের প্রায় ৯০ শাতাংশ পরিবার কৃষি, গবাদীপশু পালন ও ইছামতি বিলের মৎস আরোহনের ওপর নির্ভরশীল। তাদের যাতায়াতের একমাত্র এই রাস্তা। রাস্তাটিতে ৫০ বছরেও ইটের ছোয়া পড়েনি। স্থানীয়রা আক্ষেপ করে বলেন, ভোট এলেই চেয়ারম্যান/মেম্বাররা আসে। ভোট চলে গেলে কেউ তাদের খোজ নেয়না। এবছর দেখেছি একটা ভেকু মেশিন দিয়ে কিছু মাটি কেটে রাস্তার ওপর দিয়েছে। তবে পুরো কাজ করার আগেই ভেকু মেশিন নষ্ট হয়ে এখনো রাস্তার ওপর পড়ে রয়েছে। এখন বর্ষাকাল, রাস্তাটি ব্যবহার অনুপোযোগি হয়ে দুর্ভোগ আরও বেড়েছে । এখানে একটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে । বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা বদলি হয়ে এসে বেশিদিন থাকেনা । বর্ষাকালে রাস্তাটিতে যন্ত্রচালিত বা, বাইসাইকেল না চলায় ফের বদলী হয়ে চলে যায়, ফলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান চরমভাবে ব্যহত হয় । রাস্তাটি পাকা করনে তারা এমপি সাহেবের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ।

পৌর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত মোল্যার মাঠ । এ মাঠে এলাকার ক্রীড়া মোদিদের পাশাপাশি সকল ধরণের সরকারী-বেসরকারী অনুষ্ঠান হয়ে থাকে । এই মাঠে একটি মাত্র মঞ্চ, যেখানে বসে অতিথিরা বিভিন্ন ধরণের খেলাধুলায় কৃতি খেলোয়াড় ও সরকারী-বেসরকারী অনুষ্ঠানের পুরুস্কার বিতরন করে থাকেন । মঞ্চটি প্রায় ২-৩ বছর আগে ঝড়ে উপরের চালা উড়ে গেলেও মেরামতের কোন উদ্যোগ নেয়নি স্থানীয় প্রশাসন । বিষয়টি স্থানীয় সাংসদের গোচরীভূত হলে তিনি মঞ্চটি সংস্কারের জন্য এ অর্থ বছরে টি আর প্রকল্পের ১ লক্ষ টাকা বরাদ্ধ দেয় । বরাদ্ধকৃত সমুদয় অর্থ উত্তোলন করা হলেও মঞ্চটি সংস্কার করা হয়নি । মঞ্চটি রয়েছে তার পূর্বের চেহারায় । প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি (পিআইসি) লোহাগড়া উপজেলা পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ফারহানা ইয়াসমিন ইতি বলেন, মঞ্চটি সংস্কারের জন্য যে অর্থ বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে তা খুবই কম, আরও কিছু টাকা বরাদ্ধ পেলে কাজ করা হবে ।

প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) বিহীন প্রকল্প ইতনা ইউনিয়নের পার ইছাখালী মাঠ ও লাহুড়িয়া শিকদার বাড়ির পাশে বজ্রপাত প্রতিরোধ স্থাপনের জন্য যন্ত্রাদি ক্রয় ও যন্ত্র স্থাপনের জন্য আর সি সি পিলার নির্মাণ এবং ৪টি প্রকল্পের দুইটি স্থানে ৪টি ২’শ ফুট আর্থিং স্থাপনের খনন কাজের প্রতিটি প্রকল্পের বিপরিতে ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা করে ১৪ লক্ষ টাকা বরাদ্ধ দেওয়া হয় ।
পার ইছাখালী ও শিকদার বাড়ির পাশে দেখা যায়, অনুমান ৪০ফুট করে দুটি লোহার পাইপে আর্থিং (জিআই) তার লাগিয়ে মাটির ভিতর দেওয়া হয়েছে । স্থানীয়রা বলেন, কোন খনন কাজ করা হয় নাই । কোনমতে একটা লোহার খাম্বা বসিয়ে লোকজন চলে গেছে, তারা জানেনা এই লোহার খাম্বায় তাদের কি উপকার হবে । অধিকাংশ প্রকল্পে একই চিত্রের বিষয়টি তুলে ধরে এলাকার বাসিন্দারা জানান, কি কাজ কোথায় হচ্ছে কত টাকা বরাদ্ধ এর কিছুই তারা জানেন না, প্রকল্পের কোন সাইন বোর্ডও টানানো হয়না, কৌশলে দুর্নীতি করা হচ্ছে । তারা বলেন এম পি সাহেব একজন শতভাগ স্বচ্ছ ও ভাল মানুষ, প্রকল্প বাস্তবায়নে তিনি হস্তক্ষেপ করলে গ্রামীণ জনপদের রাস্তাঘাটের ব্যাপক উন্নয়ন হবে বলে তারা আশাবাদী।

এ বিষয় উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো: ইসরাফিল হোসেন বলেন, এক সাথে অনেক প্রকল্প । সবগুলো প্রকল্প দেখা সম্ভব হয়না । বজ্রপাত প্রতিরোধ স্থাপনের জন্য যন্ত্রাদি ক্রয় ও যন্ত্র স্থাপনের জন্য আর সিসি পিলার নির্মাণ ৪টি প্রকল্প ঢাকার এক কোম্পানী করেছে, যদি কোন প্রকল্পে অনিয়ম হয়ে থাকে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে ।

Print Friendly, PDF & Email
basic-bank

Be the first to comment on "লোহাগড়ায় টিআর প্রকল্পের অর্থ নয়ছয়!"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*