নিউজ ডেস্ক ॥ নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত এককালের খরস্রোতা নবগঙ্গা নদী শুকিয়ে শীর্ণকায় খালে পরিনত হয়ে পড়েছে। নদীর বিস্তীর্ন এলাকা জুড়ে জেগে উঠেছে অসংখ্য ছোট-বড় চর। স্থানীয় ভূমি দস্যূরা ভূমিহীন সেজে নামে-বেনামে চর দখল করে ধান চাষ ও বসতবাড়ি তৈরি করে বসবাস করছে। প্রতি বছর বর্ষা মৌসূমে পলি মাটি পড়ার দরুণ নদী ভরাট হয়ে জেগে উঠেছে ছোট-বড় অসংখ্য চর। নাব্যতা সংকটের কারনে নৌ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়েছে।
জানা গেছে, নড়াইল জেলার মধ্যে সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময়ী জনপদ লোহাগড়ার উপর দিয়ে মধুমতি, নবগঙ্গা ও বানকানা নদী প্রবাহিত। এ ছাড়াও রয়েছে অসংখ্য খাল, বিল ও বাওড়। বানকানা নদীর কোন অস্থিত্বই আজ আর লোহাগড়ায় নেই। ৫০ বছর আগেই সমতল ভূমিতে পরিনত হয়ে পড়েছে এক সময়কার বানকানা নদী।
নবগঙ্গা নদীটি লোহাগড়া উপজেলার অন্যতম প্রধান নদী ও যাতায়াতের তখনকার এক মাত্র মাধ্যম। এই নদীতে আশির দশকেও অসংখ্য লঞ্চ চলতো এবং পাল তোলা নৌকায় গুন টেনে পন্য আনয়ন করতেন ব্যাবসায়ীরা। দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসার জন্য নদী পথে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করতেন রোগী নিয়ে। নাব্যতা সংকট ও কালের বিবর্তনে নবগঙ্গা নদীর সেই জৌলুস আর নেই। নেই সেই আগ্রাসী রূপ। এককালের খরস্রোতা নবগঙ্গা নদী শুকিয়ে খালে পরিনত হয়ে পড়েছে। নবগঙ্গার কুন্দশী এলাকা থেকে মহাজন এলাকা পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটারের অবস্থা এতটাই সঙ্গীন যে, অনেক এলাকায় নবগঙ্গা শুকিয়ে পায়ে চলা সরু পথে পরিণত হয়ে পড়েছে। এমনকি নদীতে বাঁধ দিয়ে মৎস্য শিকারীরা মাছ শিকার করছে।
শীত মৌসূম শুরুর সাথে সাথে নবগঙ্গা নদীর নাব্যতা অস্বাভাবিক ভাবে কমে গেছে। নদী শুকিয়ে যাওয়ার কারণে লোহাগড়া-নড়াইল ভায়া খুলনা রুটে নৌ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। ফলে নৌ পথে পণ্য পরিবহনে চরম সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে ব্যবসা বানিজ্যে নেমেছে ধস।
অনুসন্ধান কালে আরও জানা গেছে, নবগঙ্গা নদীর প্রায় ৩৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে জেগে উঠেছে ছোট-বড় অসংখ্য চর। স্থানীয় ভূমি দস্যূরা নামে-বেনাম ভুয়া কাগজ পত্র তৈরী করে চর দখল করে ধানের চাষাবাদ করছে। লোহাগড়ায় চর দখলের ঘটনা প্রতি বছরই বাড়ছে। সেই সাথে বাড়ছে মামলা-মোকদ্দমা। মৃতপ্রায় নবগঙ্গার নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য বিগত ২০১১-১২ অর্থ বছরে ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে মল্লিকপুর থেকে মহাজন পর্যন্ত খনন কাজ করা হলেও তা কোন কাজে আসে নাই। প্রতি বর্ষা মৌসূমে পলি পড়তে পড়তে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে।
লোহাগড়া পৌরসভা মেয়র আশরাফুল আলম ও গোপীনাথপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ রেজাউল করিম রেজা খান, নবগঙ্গা নদীর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আক্ষেপ করে বললেন, ‘নদী শাসন আইন নবগঙ্গার জন্য কার্যকর হয় না। প্রকাশ্যে চলছে নবগঙ্গা নদী দখলের প্রতিযোগিতা’।
নদী বাঁচাও আন্দোলনের নেতা আব্দুল হাই সরদার বলেন, ‘নবগঙ্গার নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য নদী খনন জরুরী হয়ে পড়েছে’।
কুন্দশী গ্রামের মৎস্যজীবী গণেশ ও সনজয় বিশ্বাস,লক্ষীপাশা গ্রামের জিতেন,সনজিত ও নেপাল বিশ্বাস বলেন, ‘এই নবগঙ্গা নদীই আমাদের রুটি-রুজির উৎস,মৎস্য শিকার করে ছেলে মেয়ে নিয়ে সুখে শান্তিতেই ছিলাম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় জীবন জীবিকার পথ বন্ধ হয়ে গেছে’।
পৌরসভার লোহাগড়া ব্রীজের নিকট গিয়ে দেখা গেছে, অথৈই পানি আর নেই নবগঙ্গার বুকে। নেই সেই তর্জন-গর্জন। ফারাক্কার বিরুপ প্রভাবে ক্রমাগত নাব্যতা সংকটে পড়ে এক কালের খরস্রোতা নবগঙ্গা নদী শুকিয়ে খালে পরিনত হয়ে পড়েছে। আর জেগে উঠা চরগুলো ধান চাষের অন্যতম আঁধারে পরিনত হয়ে পড়েছে এই নদীটি।
অস্তিত্ব সংকটে লোহাগড়ার নবগঙ্গা নদী
অস্তিত্ব সংকটে লোহাগড়ার নবগঙ্গা নদী
Be the first to comment on "অস্তিত্ব সংকটে লোহাগড়ার নবগঙ্গা নদী"