ক্যাসিনোর টাকা যেভাবে বহন করতো এনামুল-রূপন

ক্যাসিনোর টাকা যেভাবে বহন করতো এনামুল-রূপন

নিউজ ডেস্ক॥ এনামুল হক ওরফে এনু ও রূপন ভূঁইয়ারা ছয় ভাই। গেণ্ডারিয়ার বাসিন্দা এনুরা স্থানীয় হলেও একসময় তাদের আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না। অনেকটা ভবঘুরে স্বভাবের ছিলেন এনু। কোনো নির্দিষ্ট পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তার বাবার ধোলাইখালে টং মার্কেটে মেশিনারিজ পার্টসের দোকান ছিল। এনু-রূপন দুই ভাই পান খেতেন আর এলাকার এ মাথা থেকে ও মাথা চষে বেড়াতেন। ১৯৮৫ সাল থেকে এনু ওয়ান্ডারার্স ক্লাব ও রূপন আরামবাগ ক্লাবে জুয়া খেলা শুরু করে। খেলতে খেলতে একসময় জুয়ার বোর্ডের মালিক বনে যান এই দুই ভাই। সেখান থেকেই তাদের উত্থান। আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাদের। কোনো চাকরি বা ব্যবসা না করেও ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক ফ্ল্যাট ও বাড়ি কিনেছেন তারা। একসময় রিকশা ব্যবহার করলেও এখন ল্যান্ড ক্রুজারের মতো দামি গাড়ি বদলানো তাদের নেশায় পরিণত হয়েছে। ঢাকা শহরে তাদের অর্ধশত বসত বাড়ির সন্ধান পেলেও কোথায় তারা স্থায়ীভাবে বসবাস করেন এ বিষয়ে জানেন না অনেকেই।

বর্তমানে গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এনামুল হক এনু ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের একজন শেয়ার হোল্ডার। আর তার ভাই রূপন ভূঁইয়া থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। মঙ্গলবার অভিযানে এনামুল ও রূপনের কব্জায় থাকা পাঁচ কোটি পাঁচ লাখ টাকা ও ৭২০ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার করে র‌্যাব। এনামুলের বাসা, তার এক কর্মচারী ও বন্ধুর বাসায় রাখা পাঁচটি ভল্টে এ টাকা ও স্বর্ণ রাখা হয়েছিল। বিপুল পরিমান টাকা ও স্বর্ণ উদ্ধারের পর এখন এ আলোচনা এলাকার সর্বত্র। মানুষজনের মুখে মুখে বেরিয়ে আসছে তাদের অপকর্মের নানা কাহিনী। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বিভিন্ন স্থান থেকে এনামুল ও রূপনের লোকজন টাকা নিয়ে আসতো একটি কালো কাচ ঘেরা গাড়িতে করে। ওই গাড়ির সামনে তারা সাদা কাগজে পুলিশ লেখা স্টিকার লাগিয়ে চলাফেরা করতো। এতে কারও মনে কোন সন্দেহ হতো না।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, অনেক সময় বস্তা বা ব্যাগে করে তারা টাকা নিয়ে আসতো। স্থানীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, কিছু দিন আগে টাকা রাখার জন্য এক সঙ্গে এনামুল পাঁচটি ভল্ট তৈরির অর্ডার দেন। দোকানে এ ভল্ট তৈরির সময়ই স্থানীয়রা নানা আলোচনা শুরু করেন। বিষয়টি আইন শৃঙখলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও অবহিত করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এরপরই ওই ভল্টের মালিকের বিষয়ে নজর রাখে র‌্যাবসহ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। একটি সূত্রের দাবি ক্যাসিনোসহ বিভিন্ন অবৈধ পথে আয় করা টাকা এনামুলের বাসায়ই রাখতেন। সম্প্রতি ক্যাসিনো ডন ও টেন্ডারবাজদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর পর সতর্ক হয়ে যান এনামুল। তিনি তার বাসায় রাখা দুটি টাকার ভল্ট এক কর্মচারী ও এক বন্ধুর বাসায় সরিয়ে রাখেন। এ দুই ভল্টে প্রায় চার কোটি টাকা পাওয়া যায়।
সরজমিনে দেখা গেছে, গেন্ডারিয়া মুরগিটোলার ৬তলা ভবনের তিনটি ফ্ল্যাট রূপনের আর বাকী তিনটি এনুর নামে। বাসার চারপাশে অনেকটা গুমোট ভাব। বাসার গেটে বড় একটি তালা ঝুলানো।।

দ্বিতীয় তলায় থাকেন এনুর শ্বশুর-শাশুড়ি। ভবনের পাশে বসবাসরত এক ভাড়াটিয়া বলেন, এই বাসার মালিক আসলে কে বা কারা আমরা জানিনা। তাদের মুখ আজ পর্যন্ত আমরা দেখিনি। শুধু নাম শুনি। তারা নাকি আওয়ামী লীগের বড় নেতা। গত পাঁচ থেকে ছয় মাস আগে এই ভবনটি তৈরি করা হয়। এখানে আগে রিকশার গ্যারেজ ছিল। ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা যায় একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী বাসা ধোয়া মোছা করছেন। বাসার ভেতরে দুটি রুমের সব আসবাবপত্র এলোমেলো। স্বর্ণ ও টাকার ভল্ট উদ্ধার করা রুমটিতে কাঠের আলমারির দরজা ভাঙ্গা।

বিছানা চাদর, জানালার পর্দা সবকিছুই এলোমেলো। ভবনের পঞ্চম তলার ফ্ল্যাটের সাবলেট ভাড়াটিয়া বলেন, তিন রুমের এই ফ্ল্যাটের একটি রুম ভাড়া নিয়ে আমরা চার সদস্যের পরিবার থাকি। আমার স্বামীর ছোট্ট একটি চা-পানের দোকান আছে। বড় মেয়ে আর আমি বাসা বাড়িতে কাজ করি। একমাস আগে আমরা বাসা ভাড়া নেই। ভাড়া পাঁচ হাজার টাকা। এই বাসার মালিক এখানে থাকেন না। বাসার ম্যানেজারই মূলত এখানে থাকতেন। ঘটনার পরদিন থেকে ম্যানেজারের কোনো খবর নেই। বাসায় স্বর্ণ ও টাকার ভল্ট প্রসঙ্গে বলেন, তাদের রুমে যে এতোগুলো টাকা বা স্বর্ণ ছিল এটা আমরা বুঝতেই পারিনি। কারণ ওই রুমে সবসময় ম্যানেজার থাকতেন। ওখানে আমরা কখনোই যেতাম না। বাসা রেড না দিলে হয়তো আমরা কখনোই জানতাম না এই বাসায় এতো টাকা আর স্বর্ণ আছে। ভাড়াটিয়া পরিচয়ে একজন বলেন, আমরা ভাড়াটিয়া। তবে তারা দুই ভাই তো খুব ভালো মানুষ। এর বেশি কিছু জানিনা। পরে জানা গেলো তিনি এনুর শ্বশুর।

এলাকার অপর এক বাসিন্দা জানান, তাদের মূল ব্যবসা ছিল ক্যাসিনো, হাউজি। তাদের বাবাও এই ব্যবসায়ের সঙ্গে একসময় যুক্ত ছিল। এখন ছেলেরা করছে। তারা দুই ভাই মানিকজোড়ের মতো সব ব্যবসাই একত্রে করেন। এলাকায় তাদের ক্যাসিনো ব্যবাসায়ী নামে ডাকা হয়। তাদের অন্য কোনো ব্যবসা নেই। শুধুমাত্র ক্যাসিনোর টাকা দিয়ে এসব বাড়ি গাড়ি করেছে।

এনামুল ও রূপনের ক্যাসিনোর সার্বিক বিষয় দেখাশোনা করতো জামাল আর ছাত্রলীগের হাসান। হাসান হচ্ছে স্থানীয় কাউন্সিলরের ভাগিনা। যাবতীয় টাকা পয়সা ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্পন্ন করতেন হাসান। জামাল বিভিন্ন স্থান থেকে টাকা সংগ্রহ করে পাঠায়। শুদ্ধি অভিযানের আগে ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে টাকা নিয়ে পালিয়েছে হাসান ও জামাল। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ওইদিন রাতে একটি গাড়ির ভেতরে অনেকগুলো বস্তা ছিল। গাড়ির সামনে সাদা কাগজে কৌশল করে তারা পুলিশ লেখা একটি স্টিকার লাগিয়েছিল। গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ করতেন স্থানীয় ওয়ার্ড যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সহ সভাপতি জামাল। গাড়িতে পুলিশ লিখে টাকা পরিবহন করতো তারা। অভিযানের আগের রাতে দুটি গাড়িতে টাকার বস্তা নিয়ে ছয়জন লোক ওই এলাকায় যাতায়াত করেছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

Print Friendly, PDF & Email
basic-bank

Be the first to comment on "ক্যাসিনোর টাকা যেভাবে বহন করতো এনামুল-রূপন"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*