রোহিঙ্গাদের মানবিক দৃষ্টিতে দেখতে হবে

নিউজ ডেস্ক : একদল মানুষ জীবন বাঁচানোর জন্য ছুটে আসবে বাংলাদেশে। আর বাংলাদেশ তাদের ঠেলে পাঠিয়ে দেবে সমুদ্রে, এটা কোনোভাবেই মানবিক হতে পারে না। রোহিঙ্গাদের যারা বাংলাদেশে এসেছে তাদেরকে মানবিক দৃষ্টিতেই দেখতে হবে। সেইসঙ্গে দেশের নিরাপত্তায় সতর্কও থাকতে হবে।
রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রসঙ্গে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল- বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামানের পক্ষে রাজেকুজ্জামান রতন দ্য রিপোর্টকে বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা যদিও মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। তবুও এর দায় বহন করতে হয় বাংলাদেশকে। ফলে বাংলাদেশের উচিত বিষয়টি আন্তর্জাতিক ফোরামে উত্থাপন করা এবং সমাধানের জন্য সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করা।
তিনি বলেন, একদল মানুষ জীবন বাঁচানোর জন্য ছুটে আসবে বাংলাদেশে। আর বাংলাদেশ তাদেরকে ঠেলে পাঠিয়ে দেবে সমুদ্রে, এটা কোনোভাবেই মানবিক হতে পারে না। ফলে মানবিক দিক বিবেচনা করে সারা পৃথিবীর মানুষের কাছেই আমাদের আবেদন এই সমস্যার একটা গ্রহণযোগ্য সমাধানের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।
এ সমস্যা বাংলাদেশে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক চাপ সৃষ্টি করছে। মুসলিম মানসিকতাকে যে কেউ উস্কে দিতে পারে। এ সমস্যার ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এ বাসদ নেতা বলেন, বাংলাদেশ সরকারকে এ-ব্যাপারে আরও সক্রিয় হওয়া উচিত। শুধু আশ্রয় নয়, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বসহ এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে প্রবীণ সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা, কবি আলতাফ চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বসবাস মূলত স্বাধীন সার্বভৌম আরাকান রাজ্যে। ব্রিটিশরা যখন বাংলা থেকে শুরু করে পালাক্রমে একের পর এক ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল দেশ রাজ্য করায়ত্ব করছিল তখনও আরাকান স্বাধীন রাজ্য ছিল। আজকের মিয়ানমার অর্থাৎ সেই কালের বার্মা বা ব্রহ্মদেশও স্বাধীন ছিল। তবে আরাকান ও বার্মা এক স্বাধীন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আওতায় ছিল না। আরাকান ও বার্মা দুটি পৃথক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র ছিল। ইংরেজরা একের পর এক ভারতবর্ষের বিভিন্ন দেশ রাজ্য করায়ত্বের পাশাপাশি আরাকান এবং বার্মাকেও করায়ত্ব করে ফেলে।
এখানে উল্লেখযোগ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বাধীন আরাকান রাজ্যের অধিবাসী প্রধান দুই ধর্মীয় জনগোষ্ঠী মুসলমান ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়গত দ্বন্দ্ব তখন কমবেশি বিরাজমান ছিল। কারণ আরাকান দেশটির শাসন ক্ষমতায় বেশিরভাগ সময় বহাল ছিল মুসলিম শাসকরা। ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদীরাই এই দ্বন্দ্বটিকে কাজে লাগালো এবং এক পর্যায়ে আরাকানকে বার্মা প্রশাসনের আওতাভুক্ত বা একীভূত করে ফেললো। ক্ষমতা হারানো মুসলমানদের সঙ্গে বৌদ্ধদের এই দ্বন্দ্ব তখনও বিরাজিত ছিল।
ব্রিটিশ ইংরেজরা ভারতবর্ষ ছেড়ে যাওয়ার সময় জোর দাবি উঠেছিল আরাকান-আরাকান থাকবে। বার্মা-বার্মা থাকবে। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদীরা চাতুর্যের সঙ্গে এই দাবি এড়িয়ে গেল এবং দ্বন্দ্ব বিরাজমান রাখলো।
আরাকানের অধিবাসী মুসলমান সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গা মুসলমান হিসেবে অভিহিত করা হয়। তবে তাদের পূর্বপুরুষের বাড়ি কখনোই বাংলাদেশে ছিল না। তারা বাঙালিও নয়। তারা আরাকানি এবং আরাকানের আদি বাসিন্দা। বার্মা সরকার যেমন করে বার্মার নাম বদল করে মিয়ানমার বানিয়েছে তেমনি করে আরাকানের নাম বদলে ফেলে রাখাইন রাজ্য নামকরণ করেছে।
রাখাইনি ও আরাকানি এক নয়। কারণ রাখাইন একটি সম্প্রদায় গোষ্ঠীর নাম। আর আরাকান একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নাম। যেখানে বসবাস ছিল রোহিঙ্গা, রাখাইন, বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্ম গোত্র ও বর্ণের মানুষের।
আরাকানের শাসক যেহেতু মুসলমানরাই ছিল। সেহেতু মুসলমানরা যেমন মেনে নিতে পারে না রাখাইন শব্দটি, তেমনি বৌদ্ধরা আরাকান শব্দটি মানে না। সমস্যাটা এখানেই। আরাকান রাজ্যের স্বায়ত্তশাসন হলেই এ সমস্যা নিরসন হতে পারে। আরাকান স্বাধীন দেশ না হলেও মিয়ানমারভুক্ত একটি স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য হিসেবে মর্যাদা পেলেই সমস্যার অনেক সমাধান হয়ে যাবে।
তাহলে আমরা উপলব্ধি করতে পারছি আরাকান, রাখাইন, বার্মা তথা মিয়ানমার, রোহিঙ্গা তথা বৌদ্ধ এসব আজকের মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বা সমস্যা। জাতিগত নিপীড়ন করে আরাকানি তথা রোহিঙ্গাদের বাইরের দেশে ঠেলে দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না।
মিয়ানমারের এই অভ্যন্তরীণ সংকটকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা লুটতে চায় নব্য ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তারা তাদের পকেট সংগঠন জাতিসংঘকে দিয়ে শরণার্থীদের জন্য মায়াকান্না করে। এই ঠুঁটো জগন্নাথ জাতিসংঘ কখনোই পারবে না রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার সমাধান করতে। আবার মার্কিনের ধামাধরা ওয়াইসিও কোনো সমাধান দিতে পারবে না।
তবে আরাকান তথা মিয়ানমারের প্রতিবেশী ভারত, বাংলাদেশ, চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, জাতিসংঘ এবং ওআইসিকে এক জোট হয়ে চাপ প্রয়োগ করতে হবে মিয়ানমার সরকারের ওপর। যাতে তারা দ্রুত শান্তিপূর্ণ উপায়ে এই সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করতে পারে।
এখানে উল্লেখ্য, রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যে শুধু বাংলাদেশে আসছে তা নয়, ভারত, চীন, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়াতেও যাচ্ছে। তবে আমাদের বাংলাদেশে যারা এসেছে তাদের মানবিক দৃষ্টিতেই দেখতে হবে। রোহিঙ্গাদের শুধু মুসলমান হিসেবে না দেখে মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। মনুষ্যত্ব বিপন্ন আজ। এই প্রসঙ্গে শান্তিতে নোবেলজয়ী গণতন্ত্রের ধারক অং সাং সূচির ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি এ প্রসঙ্গে দ্য রিপোর্টকে বলেন, নাফ নদীতে ভাসতে না দিয়ে মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিবন্ধনের মাধ্যমে বাংলাদেশে সাময়িকভাবে আশ্রয় দিতে হবে। বৈধভাবে ঢুকতে না দিলেও তারা বেআইনিভাবে বাংলাদেশে ঢুকছে এবং ঢুকবে। এতে সমস্যা আরও বেড়ে বাংলাদেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তাই নাফ নদীতে ভাসতে না দিয়ে নিবন্ধনের মাধ্যমে সাময়িকভাবে ঢুকতে দিয়ে তাদেরকে ক্যাম্পে রাখতে হবে। এ-সময়ের জন্য তাদরেকে ওয়ার্ক পারমিট দেওয়াও যেতে পারে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ও রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যাকে অনেক দিক থেকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, মানবিক, নাগরিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে বাংলাদেশকেই উদ্যোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দিয়ে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। যাতে মিয়ানমার সরকার সমস্যার স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেয়।
নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক মোহাম্মদ শামসুদ্দীন এ প্রসঙ্গে দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, জনসংখ্যার ভারে নূইয়ে পড়া বাংলাদেশের ওপর রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাড়তি চাপ খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত। অমানবিক হামলা, নির্যাতন, নিপীড়নে গৃহহারা রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের মানবিক আশ্রয় দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। কিছু কিছু ভাসমান রোহিঙ্গাকে ফেরত দেওয়া খুবই অমানবিক। মিয়ানমার সরকারের বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতার শিকার এ জনগোষ্ঠীকে রক্ষায় বাংলাদেশ সরকারকে আন্তর্জাতিক ফোরমসমূহে (জাতিসংঘ, সার্ক, ওআইসি, আসিয়ান ইত্যাদি) সোচ্চার হয়ে বিশ্বজনমত গঠনে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। নিপীড়নে অভিযুক্ত মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে নিবৃত্ত করতে ও রোহিঙ্গাদের রক্ষা করতে চীন সরকারের মাধ্যমে বাংলাদেশকে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি বলেন, আধুনিক ও সভ্য পৃথিবীর দেশ হিসেবে মিয়ানমারকে বিশ্ববাসীর কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হবে। শত শত বছর ধরে বসবাসকারী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আরাকান বা রাখাইন রাজ্যে বসবাসের নাগরিক অধিকার দিতে অস্বীকৃতি জানানোই মিয়ানমার রাষ্ট্রটি এ সমস্যার মুখে পড়েছে। সমস্যা উত্তরণে মিয়ানমার জাতি রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তিকে নিবৃত্ত করা বিশ্ববাসীর দায়িত্ব। এ ব্যাপারে জাতিসংঘ এবং ওআইসি’র ভূমিকা হতাশাব্যঞ্জক ও দায়সারা গোছের।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, মিয়ানমারে প্রায় এক মিলিয়ন রোহিঙ্গার নাগরিকত্ব অস্বীকার করা হয়। এমনকি দেশটির সরকার তাদের প্রাচীন নৃ-গোষ্ঠী হিসেবেও স্বীকৃতি দেয়নি। ২০১২ সালে নিপীড়নের মুখে এক মিলিয়নের বেশি রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়। এখনও অনেক রোহিঙ্গা দেশটির জরাজীর্ণ ক্যাম্পে বসবাস করছে। মোট রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ১০ লাখের মতো হলেও এখন কয়েক লাখ মিয়ানমার ছেড়ে পালিয়ে অন্যদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের দাবি রাখাইন রাজ্যে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ চালিয়ে যাচ্ছে তারা। জাতিসংঘ এরই মধ্যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে জাতিগতভাবে নির্মূলের অভিযোগ এনেছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের নির্মূলের অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
সেনাবাহিনীর হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণের মুখে রোহিঙ্গারা জীবন বাঁচাতে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। প্রতিদিনই শত শত রোহিঙ্গা আশ্রয় নিতে সাগর ও নদীপথে পাড়ি জমাচ্ছে। তারপরও মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। এখন পর্যন্ত সেনা অভিযানে ৮৬ রোহিঙ্গা মারা গেছে।

Print Friendly, PDF & Email
basic-bank

Be the first to comment on "রোহিঙ্গাদের মানবিক দৃষ্টিতে দেখতে হবে"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*