নিউজ ডেস্ক: অব্যাহত দরপতনের ধারায় দেশের উভয় পুঁজিবাজার। মাসের প্রথম সপ্তাহে সূচকের উত্থান হলেও পরের সপ্তাহ থেকে শুরু হয়েছে পতন। গতকাল রোববার পর্যন্ত যা অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া লেনদেনও কমছে আশঙ্কাজনকহারে। বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারের দামও তলানিতে নেমে গেছে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, কিছু কারণে বাজারে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সীমা নিয়ে সৃষ্ট সিদ্ধান্তহীনতায় বিনিয়োগে আস্থা রাখতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা। এতে প্রতিদিনই বাজার থেকে উধাও হচ্ছে পুঁজি।
চলতি বছরের বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায় বছরের প্রথম কার্যদিবস ৩ জানুয়ারি লেনদেন শুরু হয়েছিল ডিএসই ব্রড ইনডেক্স ৪৬২৯ দশমিক ৬৪ দিয়ে। আর গত সপ্তাহে লেনদেন শেষ হয়েছে ৪৩৪০ দশমিক ৩৪ পয়েন্টে। অর্থাৎ এ সময়ে সূচক কমেছে ২৮৯ পয়েন্ট। এদিকে বছরের প্রথম দিনে ডিএসই’র বাজার মূলধন তিন লাখ ১৫ হাজার ৯৭৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা দিয়ে শুরু হলেও গত সপ্তাহ শেষে এই মূলধন দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮ হাজার ৫০৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এ সময়ে ডিএসই বাজার মূলধন খুইয়েছে ৭ হাজার ৪৬৯ কোটি ৯ লাখ টাকা।
পতনের এই ধারায় এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে আশায় বুক বেঁধেছিলেন বিনিয়োগকারীরা। এ সময় সপ্তাহজুড়ে সূচকের উন্নতি ঘটে লক্ষণীয়ভাবে। আগের দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ সূচক ওঠে ৭ এপ্রিল। সপ্তাহের এই শেষ দিনে ডিএসইএক্স (ব্রড ইনডেক্স) উঠে যায় ৪৪৪৩ দশমিক ০৬ পয়েন্টে। এরপর থেকেই দেখা যায় হতাশার চিত্র। পরের দুই সপ্তাহে টানা দরপতনের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আস্থা ও তারল্য সংকট চোখে পড়ে প্রকটভাবে। এই দুই সপ্তাহে মোট ৯ কার্যদিবসে সূচকের পতন হয়েছে ১০২ দশমিক ৭২ পয়েন্ট। লেনদেন কমেছে ১৬ কোটি ৫১ লাখ ৮৯ হাজার টাকা। ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ৮৩৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।
বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজারে নানা কারণে আস্থার সংকটের পাশাপাশি দেখা দিয়েছে তারল্য সংকট। একমি ল্যাবরেটরিজসহ কয়েকটি কোম্পানির আইপিও ও রাইট শেয়ারের মাধ্যমে টাকা সংগ্রহের বিপরীতে বাজারে নতুন বিনিয়োগ না হওয়ায় তারল্য সংকট দেখা দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জানা গেছে, একমি ল্যাবরেটরিজের আইপিও আবেদন শেষ হয়েছে গত সপ্তাহের শেষ দিন। কোম্পানিটি বাজার থেকে ৪০৯ কোটি টাকা সংগ্রহের অনুমতি পেয়েছে। এদিকে জিপিএইচ ইস্পাতের রাইট শেয়ারের আবেদন চলছে এখন। এর মাধ্যমে কোম্পানিটি প্রায় ২৬২ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে। জানা গেছে, আস্থাহীনতার কারণে সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে অনেকেই বিনিয়োগ তুলে নিয়ে আইপিও আবেদন করছেন। এতে টাকা আটকে থাকছে মাসাধিক কাল। এছাড়া নতুন তালিকাভুক্ত হিসেবে লেনদেন শুরু হয়েছে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার। এর আগে গত মাসে লেনদেন শুরু হয় ড্রাগন সোয়েটারের। সাধারণত নতুন শেয়ারের লেনদেন শুরু হলে আইপিওতে পাওয়া শেয়ার বিক্রি করেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। আর সেই শেয়ার কিনে নেন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। এ সময়টাতেও সেকেন্ডারি মার্কেটে তারল্য সংকট দেখা দেয় বলে জানান বাজার বিশ্লেষকরা।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগসীমা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় এক ধরনের অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে সংশোধিত কোম্পানি আইন অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর পরিশোধিত মূলধন, শেয়ার প্রিমিয়াম, সংবিধিবদ্ধ সঞ্চিতি ও রিটেইন আর্নিংয়ের মোট পরিমাণের বিনিয়োগসীমা ২৫ শতাংশের বেশি বিনিয়োগ না করার বিধান রয়েছে। যেসব ব্যাংকের বিনিয়োগ ২৫ শতাংশের চেয়ে বেশি রয়েছে তাদের বিনিয়োগ কমিয়ে আনতে হবে চলতি বছরের ২১ জুলাইয়ের মধ্যে। তবে বিনিয়োগকারীরা এই সীমা ২০২০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে মাস ছয়েক আগে অর্থমন্ত্রী ব্যাংকের বিনিয়োগ সীমা বাড়ানোর কথা বলেছেন। কিন্তু এখনও সুস্পষ্ট কোনো ঘোষণা দেয়া হয়নি। ফলে বিষয়টি ধোঁয়াশার সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হচ্ছে না। এ অবস্থায় নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা।
২০১০ সালে পুঁজিবাজারে মহাধসের আগে বাজারে আগ্রাসীভাবে বিনিয়োগ করে ব্যাংকগুলো। ওই সময়ে বিনিয়োগের সীমা ছিল ব্যাংকের মোট আমানতের ১০ শতাংশ। কিন্তু সে সময় আইনের তোয়াক্কা না করে ব্যাংকগুলো বাজারে বিনিয়োগ করতে থাকে। কোনো কোনো ব্যাংক আমানতের ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ করে। ফলে মৌলভিত্তি উপেক্ষা করে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারের দাম সীমাহীনভাবে বেড়ে যায়। এরপর ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ তুলে নিলে বাজারে বিপর্যয় নেমে আসে। এ নিয়ে খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশের আলোকে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ সীমা কমিয়ে আনা হয়।
এ বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ব্যাংকের বিনিয়োগ সমন্বয় নিয়ে দীর্ঘদিন কথা হচ্ছে। তবে এ ব্যাপারে পরিষ্কারভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখে বাজারে বিভ্রান্তি ছড়ানো উচিত নয়।
সূত্র: মানবকণ্ঠ

Be the first to comment on "আস্থার সংকটে পুঁজিবাজার"