নিউজ ডেস্ক : এক সময়ে খুচরো ব্যবসায় প্রত্যক্ষ বিদেশি লগ্নি নিয়ে মনমোহন সরকারের প্রস্তাবে প্রবল আপত্তি করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বহুজাতিক সংস্থার হাতে কৃষকের স্বার্থ বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। কিন্তু এ বার কার্যত সেই সংস্কার প্রস্তাবে নিজেই সায় দিলেন মমতা। কৃষকের উৎপন্ন ফসল বাজারজাত করতে বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে হাত মেলানোর প্রস্তাবে অনুমোদন দিল রাজ্য মন্ত্রিসভা।
কী হবে তাতে?
খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ দফতর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এলাকা ভিত্তিতে কৃষকদের একত্র করে উৎপাদক সংস্থা গড়ে তোলা হবে। একে বলা হবে, ‘ফার্মার্স প্রডিউসার কোম্পানি’। কৃষকদের এই সংস্থার সঙ্গে অন্য কোনও দেশীয় বা বহুজাতিক বেসরকারি সংস্থা এই শর্তে চুক্তি করবে যে— তারা চাষের জন্য বীজ, সার, কীটনাশক এবং উন্নত প্রযুক্তি দেওয়ার বিনিময়ে আগে থেকে ঠিক করা দামে সব ফসল কিনে বাজারজাত করবে।
রাজ্য এই ব্যবস্থাকে চুক্তি চাষ না বলে বলছে— ‘পার্টিসিপেটরি ফার্মিং’ তথা অংশগ্রহণমূলক চাষ। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ দফতর সূত্রে বলা হচ্ছে, এর মধ্যেই ৭০টি উৎপাদক সংস্থা গড়া হয়েছে। এক একটি সংস্থায় ১ হাজার থেকে ১৭০০ জন কৃষক রয়েছেন। এর মধ্যে আবার শুধু সব্জি উৎপাদক সংস্থা রয়েছে ১৮টি। এমন আরও ১০টি সংস্থা গড়ে তোলার কাজ চলছে। বেসরকারি সংস্থাগুলি যাতে এই কৃষক সংগঠনগুলির সঙ্গে চুক্তি করে, সে জন্য পুজোর পর থেকেই ঢালাও প্রচার শুরু করবে সরকার। গোটা ব্যবস্থায় অবশ্য সরকারের কোনও অংশীদারি থাকবে না। তবে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ দফতরের প্রধান সচিব বি বি গোপালিকা জানান, ‘‘চুক্তিতে সাক্ষী হিসাবে থাকতে চায় রাজ্য। এটা হলে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন বা কৃষক স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে নজরদারি রাখা যাবে।’’
সচিবের কথায়, অংশগ্রহণমূলক চাষে লাভ হবে উভয় পক্ষেরই। একে তো ফসলের গুণমান বজায় রাখতে ও উৎপাদন বাড়াতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ এবং উন্নত বীজ, সার, কীটনাশক পাবেন কৃষকরা। তার পর ফসল বিক্রি এবং দাম পাওয়া নিয়ে তাঁদের কোনও মাথাব্যথা থাকবে না। খরা-বন্যায় চাষের ক্ষতি মোকাবিলায় থাকবে ফসল বিমাও। তা ছাড়া দালাল-ফড়েদের উৎপাত কম থাকায় গ্রাহকরাও ন্যায্য দামে কৃষিজ পণ্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
আবার বেসরকারি সংস্থাগুলিও কৃষি ভিত্তিক শিল্প বা বিপণির জন্য সুনিশ্চিত সরবরাহ পাবে। ওই কৃষিপণ্য তারা পাইকারি-খুচরো বিক্রি ছাড়া রফতানিও করতে পারবেন। সব চেয়ে বড় কথা, ফসলের গুণমান নিয়ে আপস করতে হবে না। কারণ, তার নিয়ন্ত্রণ থাকবে তাদেরই হাতে। কী ফসল চাষ হবে, সেটা অবশ্য ঠিক করবে দু’পক্ষ আলোচনায় বসে
সরকারি অফিসারেরা জানাচ্ছেন, অতীতে মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এই পদ্ধতিতে চাষের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন। ‘মেট্রো ক্যাশ অ্যান্ড ক্যারি’ সংস্থাকে তিনি এ জন্য লাইসেন্সও দিয়েছিলেন। কিন্তু ফরওয়ার্ড ব্লক ও আরএসপি-র মতো শরিকদের বাধায় শেষ পর্যন্ত এগোতে পারেননি তিনি। বিরোধী দল হিসাবে তৃণমূল কংগ্রেসও তখন আপত্তি করেছিল। পরে অবশ্য দেখা গিয়েছে, মেট্রো বা পেপসি-র সঙ্গে চুক্তি করে উত্তর চব্বিশ পরগনা ও হুগলির একাংশ কৃষক লাভবানই হয়েছেন। তার পরেও আপত্তি পুরোপুরি ঘোচেনি রাজনৈতিক স্তরে। যেমন প্রাক্তন কৃষিমন্ত্রী ও ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা নরেন দে শুক্রবারও বলেন, ‘‘অংশগ্রহণমূলক চাষ বলতে সরকার যা বোঝাতে চাইছে তা আসলে নতুন মোড়কে পুরনো প্রস্তাবই। এতে কৃষকের জমি বেসরকারি হাতে চলে যাবে। তারাই ঠিক করে দেবে কী চাষ হবে, কতটা হবে। কৃষকের কোনও ভূমিকা থাকবে না।’’
তবে নরেনবাবুর বক্তব্য খণ্ডন করে তাঁর এক সময়ের সতীর্থ বর্তমান খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ মন্ত্রী রেজ্জাক মোল্লা বলেন, ‘‘উনি ঠিক বলছেন না। এখানে কোনও এক জন কৃষকের সঙ্গে বেসরকারি সংস্থার চুক্তি হচ্ছে না। কৃষক সংস্থার সঙ্গে চুক্তি হবে শিল্প সংস্থার। তাই জমি চলে যাওয়ার ভয় নেই। বরং চুক্তিতে স্পষ্ট লেখা থাকবে— জমির মালিকানা কৃষকের কাছেই থাকবে, বেসরকারি সংস্থাটিকে লিজ হিসাবেও তা দেওয়া যাবে না।’’ রেজ্জাক আরও বলেন, ‘‘বাম আমলে আমি এর পক্ষে ছিলাম। কিন্তু সিপিএম বিষয়টা বুঝলেও শরিকরা বোঝেনি। ফলে সরকারকে পিছিয়ে আসতে হয়। এ বার সেটাই করতে চাইছি।’’
ফরওয়ার্ড ব্লক ও আরএসপি-র বিরোধিতার প্রধান কারণ ছিল দালাল-ফড়েদের স্বার্থ রক্ষা। তাঁদের যুক্তি, ফড়ে পেশায় নিয়োজিত হাজার হাজার মানুষ কাজ হারাবেন। কিন্তু অনেকেই বলছেন, নতুন ব্যবস্থায় বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে কৃষক সংস্থার মেলবন্ধনে এই মধ্যসত্ত্বভোগীরা একটা ভূমিকা নিতে পারেন। কারণ কোম্পানির কর্মীদের থেকে সহজে তাঁরা যে কোনও বিষয় মাঠে ঘাটে কাজ করা কৃষকদের বোঝাতে পারবেন।
মন্ত্রী রেজ্জাক মোল্লার দাবি, এ ধরনের চাষ ও চুক্তির বিষয়টি একান্তই তাঁর মৌলিক উদ্ভাবন। দেশের আর কোনও রাজ্যে এই ব্যবস্থা নেই। তৃণমূল নেতারাও বলছেন, মনমোহন সরকারের প্রস্তাবিত ব্যবস্থার তুলনায় রাজ্যের এই প্রস্তাব কৃষক স্বার্থের পক্ষে অনেক বেশি ভাল। কারণ, এ ক্ষেত্রে সরকারের নজরদারি থাকবে।
খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ দফতর জানিয়েছে— বেসরকারি সংস্থাগুলির জন্য যে বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে, তাতে কোথায় কোন ফসল ভাল হয় তার উল্লেখ থাকবে। ফুল, ফল এবং সব্জি উৎপাদনে গোটা দেশে পশ্চিমবঙ্গ প্রথম। মালদহ, মুর্শিদাবাদের আম, বারুইপুরের পেয়ারা-লিচু, হুগলির আলু অনন্য। কিন্তু রাজ্যের কৃষকদের ৯০ শতাংশই ছোট বা প্রান্তিক। ফসল বিক্রির টাকায় তাঁদের চলে না। সঙ্গে নানা ঝুঁকি। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় তাঁদের সুরাহা হবে মনে করেই রেজ্জাকের প্রস্তাবে অমত করেননি মুখ্যমন্ত্রী।
চাষে সুরাহা
এলাকা ভিত্তিক তৈরি হবে কৃষকদের উৎপাদক সংস্থা
তাদের সঙ্গে চুক্তি করবে বেসরকারি কোম্পানি
কোম্পানিই বীজ, সার, কীটনাশক দেবে
বিনিময়ে তারাই সব ফসল কিনে নেবে
চাষ শুরুর আগেই ফসলের দাম ঠিক হয়ে যাবে
জমির মালিকানা কৃষকদের কাছেই থাকবে
কোম্পানিকে জমি লিজও দেওয়া যাবে না
সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা

Be the first to comment on "চাষিদের সংস্থার সব ফসল আগাম কিনবে কোম্পানিই"