নিউজ ডেস্ক: বাঙালি নারীর কাছে এখনও ঢাকাই জামদানির আবেদন থাকলেও অন্য শাড়িকে জামদানি বলে চালিয়ে দেওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ করেছেন ঐতিহ্যবাহী এই শাড়ির কারিগররা।
তারা বলছেন, ভারত থেকে আনা শাড়ি ঢাকাই জামদানি বলে চালিয়ে দেওয়া ছাড়াও টাঙ্গাইল ও রাজশাহীর তাঁতের শাড়িতে জামদানির নকশা এঁকে সেগুলোকেই আসল জামদানি বলে বিক্রি করা হচ্ছে। কম দামে এসব বাহারি শাড়িতে বিভ্রান্ত হচ্ছেন ক্রেতারা।
রোববার ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে নলিনীকান্ত ভট্টশালী মিলনায়তনে ‘জামদানি প্রদর্শনী-২০১৬’ তে এসে একথা বলেন জামদানির কারিগররা।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) ও বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের যৌথ আয়োজনে ‘জামদানি প্রদর্শনী’ শুরু হয় সকাল ১০টায়। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের বিসিক শিল্পনগরীর তাঁতিদের পাশাপাশি রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁও উপজেলার কারিগররা এতে অংশ নিয়েছেন।
দশ দিনব্যাপী এই প্রদর্শনীতে জামদানি বিক্রিও শুরু হয়েছে প্রথম দিনেই।
রূপগঞ্জের বিসিক শিল্পপল্লীর জামদানি কারিগর তাঁতি মো. আনোয়ার আহমেদ বলেন, “সতের বছর আগে আমি যখন তাঁতের কাজ শুরু করি তখন সারা দেশে জামদানির চাহিদা ছিল অনেক বেশি। বাংলার নারীরা আসল জামদানি খুঁজতে আমাদের খুঁজে বেড়াতেন, দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসতেন বায়না করতে।
“সুদিন এখন হয়তো নেই, কিন্তু জামদানির আবেদন ফুরিয়ে যায়নি।”
তার অভিযোগ, “জামদানিপ্রিয় ক্রেতাদের সরলতার সুযোগ নিয়ে বাহারি নকশার শাড়ি গছিয়ে দিয়ে বলছেন, এটাই নাকি আসল জামদানি। এভাবেই জামদানির ঐতিহ্য হারাচ্ছে। ক্রেতারা মনে করেন, দেশে বুঝি আসল জামদানি নেই। দামে কম জামদানিতে তুষ্ট হয়ে পরে ঠকে আমাদের গালমন্দ করেন।”
জামদানির নকশা ঠিকমতো ফুটিয়ে তুলতে বেশি সময় ও অর্থের প্রয়োজন বলে জানান তাঁতি আমিনুল ইসলাম রিপন।
“বিভিন্ন প্রকারভেদে জামদানির নকশা করতে ৩ হাজার টাকা থেকে লক্ষাধিক টাকাও খরচ হতে পারে। সাধারণ একটি জামদানি তৈরি করতে সাধারণত তিন-চার দিন সময় লাগে, বিশেষ জামদানি তৈরি করতে ছয় মাসেরও বেশি সময় লাগে।”
তাঁতি ছাদ্দাত হোসেন বলেন, জামদানির দাম নির্ভর করে নকশার ওপরে। যে শাড়ির যত ভারি কাজ, তার দাম তত বেশি।
“জামদানি সর্বোচ্চ লক্ষাধিক টাকাও হতে পারে। সেখানে নাইলন, সিনথেটিকের নকল জামদানি তো ৮০০ থেকে ২০০০ টাকাতেই মেলে।”
বাজারে ‘নকল জামদানির’ জন্য অন্য সময়ে তেমন কাজের চাপ না থাকলেও ঈদ সামনে রেখে ব্যস্ততা বাড়ার কথা জানালেন কারিগররা।
২৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে জামদানি বুনে আসা মো. সোহেল বলেন, “ঈদ উপলক্ষে আমাদের ব্যস্ততা অনেক বেড়ে গেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জামদানি যাবে, ঢাকার ফ্যাশন হাউজগুলোতেও জামদানির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।”
জামদানির প্রদর্শনী দেখতে আসা রোমানা ইসলাম বলেন, “হাতে বোনা জামদানি শাড়ির আবেদনই আলাদা। এই শাড়ি পরলেই মনে হয়, আমি ঐতিহ্যের খুব কাছাকাছি রয়েছি। জামদানি প্রদর্শনী হচ্ছে শুনেই আমি ছুটে এসেছি।”
জামদানি তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয় বাইনের সুতা আর তানার সুতার মোড়া রাঙানোর মধ্য দিয়ে। তারপর নানা কায়দায়, নানা নকশায় তৈরি হয় দৃষ্টিনন্দন এই শাড়ি।
প্রদর্শনীতে মালা, পাখি, পাটি, মালঞ্চ, মন্দির, ময়ূর, বাঘের পাড়া, বেতন ঝোপ, দাদুর শাড়ি, তেরছি, হাজারবুটি, কল্কা, ঘুড্ডিফুল- শত মোটিফ দিয়ে সাজানো জমিন আর পাড়ের মনভোলানো নকশায় নানা জামদানির পসরা সাজিয়ে বসেছেন তাঁতীরা।
সুতি, হাফ সিল্ক ও রেশমে পুঁইডুগা পাড়, মৌর প্যাচ পাড়, করলা পাড় ও বক্স পাড়সহ নানা নকশার জামদানি এসেছে।
শাড়ির পাশাপাশি জামদানি নকশায় বেড কাভার, সোফার কুশন, টেবিল ক্লথ, স্কার্ফ, ছেলেদের পাঞ্জাবি, ফতুয়া, মেয়েদের থ্রি পিসও এখানে স্থান পেয়েছে।
দেশীয় শিল্প রক্ষায় রংবাহারি বিদেশি শাড়ির দিকে না ঝুঁকে দেশীয় জামদানির প্রতি নজর দিতে ক্রেতাদের প্রতি আহ্বান জানান বিসিক পরিচালক (বিপণন ও নকশা) মো. মোস্তফা কামাল।
তিনি বলেন, “জামদানি বুননে যেমন শ্রম বেশি, দামও তাই অন্যান্য কাপড়ের তুলনায় বেশি হবে সেটাই স্বাভাবিক। তবে যে মূল্যে ক্রেতারা ভিনদেশি কাপড় কিনছেন, সেই মূল্য কিন্তু নেহায়েত কম নয়।
“ভিনদেশি কাপড়ের প্রভাবে জামদানি শিল্প আপাতত ধাক্কা খেলেও ঠিকই আবার ঘুরে দাঁড়াবে। জামদানি ফিরে পাবে তার হারানো ঐতিহ্য।”
বিসিক তাঁতীদের নানা প্রশিক্ষণের কথা বললেও বাস্তবে তা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন নজরুল ইসলাম নামের এক কারিগর।
তাঁতিরা নানা সুযোগ-সুবিধা থেকেও ‘বঞ্চিত’ হচ্ছেন বলে অভিযোগ তার।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, অনেক তাঁতি বিসিক নগরীতে প্লট বরাদ্দ পেলেও পরে টাকার অভাবে কারখানা তৈরি করতে না পেরে প্লট বিক্রি করে দিয়েছেন।
এ সমস্যা এড়াতে তাঁতিদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে বিসিকের মহাব্যবস্থাপক মো. আবুল কাদের সরকার বলেন, “ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণার পর সরকার জামদানি শিল্পে বাড়তি নজর দিয়েছে। বিসিক তাদের নিয়ে কাজ করছে।
“তাঁতিরা নানা অভিযোগ করছেন। এসব সমস্যার বিষয়েও বিসিক ওয়াকিবহাল আছে।”
সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Be the first to comment on "‘নকলের ভিড়ে’ সুদিন হারানোর আক্ষেপ জামদানি কারিগরদের"