শিরোনাম

নড়াইলে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই ফরম বিক্রির অভিযোগ

নড়াইল প্রতিনিধিঃ নড়াইলে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ে টাকা লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। খোদ যাচাই বাছাই কমিটির সদস্যসহ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের এই অভিযোগ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি থেকে অনলাইনে আবেদনকৃত নড়াইলের কালিয়া উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই শুরু হয়েছে; যা চলবে ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। ছয় সদস্যবিশিষ্ট কমিটি যাচাই-বাছাই করছে। কমিটির সভাপতি নড়াইলের কালিয়া উপজেলা বিএলএফ কমান্ডার ইমদাদুল হক মোল্যা, সদস্য সচিব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম, সদস্য উপজেলা কমান্ডার তরিকুল ইসলাম মন্নু, মুজিবর রহমান মোল্যা, শামছুল আলম কচি, শাহাবুদ্দিন চৌধুরী এবং জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) প্রতিনিধি হিসেবে পৌরসভার সাবেক মেয়র, আওয়ামী লীগ জাতীয় কমিটির সদস্য বি এম একরামুল হক টুকু। নড়াইলের কালিয়া উপজেলা প্রশাসন এবং উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ গেজেট অনুযায়ী ৭৫৩ জন মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভূক্ত হন। এর মধ্যে ১৮ জনের নামে অভিযোগ ওঠায় তাদের ভাতা স্থগিত আছে। ভাতাপ্রাপ্ত আরো ৫৩ জনের নামে বিভিন্ন স্থান থেকে লিখিত অভিযোগ রয়েছে। এরপরে বর্তমানে অনলাইনে আবেদন করেছেন ৮২২ জন। এদেরকে ডেকে ইউনিয়নভিত্তিক সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছে। ১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যারা আসতে পারবেন না তাদের জন্য আরো কিছুদিন সময় বাড়ানো হতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলাবাড়িয়া গ্রামের একজন মুক্তিযোদ্ধা জানিয়েছেন, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার তরিকুল ইসলাম মন্নুসহ কমিটির লোকেরা কয়েকজনের কাছ থেকে মুক্তিযোদ্ধা বানানোর জন্য কয়েক লাখ টাকা নিয়েছেন। ওই মুক্তিযোদ্ধার অভিযোগ, এর আগে অনেককে এভাবে মুক্তিযোদ্ধা বানানো হয়েছিল। কিন্তু পরে তাদের ভাতা বন্ধ হয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ে বাঐসোনা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা দাবিদার মুন্সী সোহরাব হোসেন বলেন, ‘১৯৭৩ সালে আমি ভারতে একটি কাজে গিয়ে মাথায় নারিকেল পড়ে অপ্রকিতিস্থ অবস্থায় ২০-২২ বছর পরে দেশে ফিরে আসি। গত ১২ বছর ধরে টাকা দিতে পারিনি বলে আমাকে কেউ মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দেয়নি। এবারো আবেদন করেছি। আমি টাকা-পয়সা দিতে পারবো না। যদি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সত্যিকার যাচাই হয় তাহলে আমার দাবি আছে।’নড়াইলের সালামাবাদ ইউনিয়নের বিলবাউচ গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা দাবিদার তকুব্বর শেখ অভিযোগে বলেন, ‘এর আগে অনেক ভূয়া লোক কমান্ডারের সঙ্গে যোগাযোগ করে মুক্তিযোদ্ধা গেজেটে নাম উঠিয়ে সরকারি সুবিধা নিচ্ছে। আমি এর আগে আবেদন করিনি। তবে এবার অনলাইনে আবেদন করেছি। ১ ফেব্রুয়ারি সালামাবাদ ইউনিয়নের শুনানি হবে। শুনেছি অনেকে টাকা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যাবেন। আমার টাকা দেবার সামর্থ্য নেই। টাকা ছাড়া হলে হবে; না হলে কিছু করার নেই।’ নড়াইলের কালিয়া উপজেলা সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শেখ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের হিসেবে কালিয়ায় প্রথমে ৫৫৯ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। পরে চেষ্টা-তদবির করে প্রায় ৮০০ মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে সত্য স্বীকারে আমার কোনে আপত্তি নেই। অবৈধভাবে অনেকে টাকা পয়সা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার চেষ্টা করছেন। এবারে যারা আবেদন করেছেন তাদের অধিকাংশই অমুক্তিযোদ্ধা। পয়সা-কড়ির বিনিময়ে অনেকে লাইনঘাট করছেন। সঠিক যাচাই-বাছাই করলে এদের মধ্যে শতকরা পাঁচ ভাগও টিকবে না। অনেককে মুক্তিযোদ্ধা বানানোর লোভ দেখিয়ে অন্যায়ভাবে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।’ যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি ইমদাদুল হক মোল্যা বলেন, ‘সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অনেকে আবেদন করেছেন। এটা তারা করতেই পারেন। এখানে আমরা কোনো ঘুষ, দুর্নীতির আশ্রয় নিচ্ছি না। যারা এসব তঞ্চকতার আশ্রয় নিচ্ছেন, তাদের আমরা স্থান দিচ্ছি না। আমরা সবার মতামত নিয়ে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে যাচাই-বাছাই কার্যক্রম পরিচালনা করছি।’ জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) প্রতিনিধি একরামুল হক টুকু বলেন, ‘টাকা-পয়সা লেনদেনের অভিযোগ আসতেই পারে। এখানে কোনে অমুক্তিযোদ্ধা যাচাই কমিটিতে নেই; যা আগে বিভিন্ন সময়ে ছিলো। বর্তমান সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। ১৯৭১ সালে যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছে কিন্তু ৭৫ সালের পরে যারা জিয়ার সাথে থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাইরে চলে গেছে তাদেরও আমরা তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করবো না।’যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্য সচিব নড়াইলের কালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম আমাদের নড়াইল জেলা প্রতিনিধি উজ্জ্বল রায়কে জানান, ‘আবেদনকারীদের মধ্যে থেকে কেউ কেউ টাকা দিচ্ছেন এমন খবর আমার কানেও এসেছে। অনেকে টেলিফোন করে আমাকে জানিয়েছেন। এর বাইরে আমি এও শুনেছি, আবেদনের জন্য একটি ফরম আমরা বিনামূল্যে সরবরাহ করছি, সেই ফরমও নাকি বাইরে পাঁচশ-হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ঘটনাগুলো সত্যি হলে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে আমার কাছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হবে।’নড়াইলের কালিয়া উপজেলা কমান্ডার তরিকুল ইসলাম মন্নু মুক্তিযোদ্ধা যাচাইয়ে টাকা পয়সা গ্রহণের অভিযোগ অস্বীকার করেন। বলেন, ‘আপনাদের কাছে অনেক ধরনের কুকথা আসতে পারে। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। কালিয়ার সব মুক্তিযোদ্ধা নেতাকে দিয়ে বাছাই কমিটি করা হয়েছে। কেউ কোনো অন্যায়ের চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু আমরা সরকারি নীতিমালার বাইরে একচুলও ছাড় দেব না। কোনো মুক্তিযোদ্ধা নেতা যাচাই-বাছাই কমিটিতে আসতে না পেরে কমিটির নামে দুর্নাম ছড়ানোর জন্য অভিযোগ আনতে পারেন।’ বিনামূল্যের ফরম টাকায় বিক্রির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কেউ ফরম পূরণ করে দিয়ে এমন টাকা নিতে পারে। তবে ফরম বিক্রি হচ্ছে না।’নড়াইল জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এস এম গোলাম কবির বলেন, ‘যারা দুর্বল, নিজেদের প্রমাণে অক্ষম হবে সেরকম লোকের টাকা পয়সা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার একটা প্রবণতা আছে। যেহেতু সরকার ভাতা বা চাকরির ক্ষেত্রে নানা সুযোগ দিচ্ছে, তাই অনেকে আশা করছেন, জাল-জালিয়াতি করে মুক্তিযোদ্ধা বনে যাবার। সেই হিসাব করেই এতো লোক অনলাইনে আবেদন করেছেন। কেউ যদি বলে টাকা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যাচ্ছি, তাহলে আমি বলবো সে বোকার স্বর্গে বাস করে। কেউ টাকা নিলেও ভূয়া কাউকেই অন্তর্ভূক্ত করতে পারবে না। আমি জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হিসেবে তা পর্যবেক্ষণ করছি।’ মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক শহীদ একলাস উদ্দীনের ছেলে ও নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য কবিরুল হক মুক্তি বলেন, ‘যাচাই-বাছাইয়ে নানা ধরনের আর্থিক লেনদেনের খবর আমি প্রতিদিনই পাচ্ছি। বাছাইয়ের কোনো পর্যায়েই আমাকে রাখা হয়নি। কীভাবে বাছাই কমিটি হলো আমি তাও জানি না। তবে আমার কানে বিভিন্ন সময়ে অসহায় লোকদের কাছ থেকে টাকা গ্রহণের অভিযোগ এলে আমি তা ইউএনও-কে জানিয়ে রাখছি। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে আমার এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে লজ্জা হয়। একজন মুক্তিযোদ্ধা কীভাবে টাকা পয়সার লেন-দেনে জড়িত হয়, তারাতো জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। কয়েকজন নষ্ট মুক্তিযোদ্ধার এই দুর্নামের দায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলের ওপর কখনোই বর্তাবে না।

basic-bank

Be the first to comment on "নড়াইলে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই ফরম বিক্রির অভিযোগ"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*