নিউজ ডেস্ক: সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলার তদন্তে চমকে দেওয়ার মতো তথ্য আসছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কীভাবে এসব হামলা হয়েছে, তদন্তে তা খুঁজে বের করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেছেন, এই তথ্য প্রকাশ হলে ‘তাজ্জব’ বনে যেতে হবে।
তবে তদন্ত মাঝ পর্যায়ে থাকায় তা খোলসা করেননি প্রধানমন্ত্রী। এ নিয়ে ‘বেশি খোঁচাখুঁচি’ না করতে সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
জঙ্গিবাদী তৎপরতার তদন্তে ভারতের সঙ্গে পারস্পারিক সহযোগিতা চলার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘গোয়েন্দা তথ্য’ চাওয়া হয়েছে।
আতঙ্ক সৃষ্টি করাই গুলশানে হামলার উদ্দেশ্য ছিল মন্তব্য করে তিনি বলেছেন, “যে সম্মানজনক অবস্থায় নিয়ে গিয়েছিলাম বাংলাদেশকে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ মোকাবিলা করে অর্থনৈতিক গতিধারা সৃষ্টি করে, সেই সম্মানজনক অবস্থানে মনে হচ্ছে একটা ছেদ এনে দিল।”
আসেম সম্মেলন থেকে ফেরার পরদিন রোববার গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে এসব বলেন শেখ হাসিনা।
এক সাংবাদিক গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার তদন্তের অগ্রগতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, “তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর আপনারাই (সাংবাদিক) তাজ্জব হয়ে যাবেন।
“তদন্ত কতটুকু এগোলো, সব কথা তো বলা যাবে না। বলে ফেললে তদন্ত তো ওখানে শেষ হয়ে যাবে। কাজেই এখানে যতটুকু ঠিক বলা প্রয়োজন ততটুকু বলা যাচ্ছে। এখনও তদন্তের অনেকগুলি ধাপ আছে, কাজ আছে। সেগুলি কিন্তু করা হচ্ছে এবং খুঁজে খুঁজে বের করা হচ্ছে।
মঙ্গোলিয়ার উলানবাটোরে সাম্প্রতিক এশিয়া-ইউরোপ (আসেম) শীর্ষ সম্মেলন শেষে দেশে ফিরে গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: পিআইডি
“এবং ভবিষ্যতে আরও এমন এমন জিনিস বের হবে যখন সম্পূর্ণটা সফলভাবে করতে পারব যে, আপনারা নিজেরাই তাজ্জব হয়ে যাবেন কীভাবে এই কাজগুলি এরা করেছে।”
সাম্প্রতিক এই দুই হামলায় অংশ নিয়ে নিহতদের মধ্যে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ঢাকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা রয়েছেন।
গুলশানে কমান্ডো অভিযানে নিহত নিবরাজ ইসলাম এবং শোলাকিয়ায় পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলিতে নিহত আবীর রহমান নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন।
গুলশান হত্যাকাণ্ডের পর ‘মুক্ত হওয়া’ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক আবুল হাসনাত রেজাউল করিমও পুলিশের সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন। হামলাকারীদের বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় নিজের ফ্ল্যাটে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে শনিবার নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপ-উপাচার্য গিয়াস উদ্দিন আহসান এবং তার ভাগনে ও বাসাটি দেখভালের দায়িত্বে থাকা একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
শিক্ষকরা কীভাবে ছাত্রদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয় বা জঙ্গিবাদের দিকে ঠেলে দেয় সে প্রশ্ন তোলেন শেখ হাসিনা।
সন্ত্রাসবাদ এখন বাংলাদেশের একার সমস্যা নয়, বিশ্ব সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সচেতনতা শুধু আমার দেশের মধ্যেই না, সারা বিশ্বব্যাপীই হচ্ছে। হ্যাঁ, এর পেছনে, এটার শুরু কীভাবে হল, মদদদাতা কারা, কোত্থেকে একটার পর একটা কী হচ্ছে, এ ব্যাপারেও কিন্তু অনেকেই সচেতন।”
অচিরেই এর বিরুদ্ধে বিশ্ববাসী সরব হবে আশা প্রকাশ করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, “হয়তো এখনও সবাই সোচ্চার হচ্ছে না। কিন্তু সেইদিন বেশি দূরে না যেদিন মানুষ সকলেই সোচ্চার হবে।”
বাংলাদেশ সব সময় সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদবিরোধী-মন্তব্য করে সবাইকে এর বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান শেখ হাসিনা।
“স্ব-স্ব অবস্থানে থেকে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে আহ্বান জানাচ্ছি।”
যারা ধর্মের নামে তরুণদের জঙ্গিবাদে জড়াতে উসকানি দিচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।
সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলায় সমাজের উঁচু স্তরের পরিবারের ছেলেদের জড়িত থাকার বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “যাদের কোনো অভাবে নেই, ভালো খায়, ভালো পরে, তারাই এখন জঙ্গিবাদে জড়াচ্ছে।
“যেখানে তাদের জন্য কোনো কিছুই অপূরণীয় থাকে না, সেখানে কেন তারা এটা করছে, এর যৌক্তিকতা কী?
“তারা এখন বেহেস্তের হুর-পরী পাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, এর কী যৌক্তিকতা? কারা তাদের পেছন থেকে উসকাচ্ছে?”
এই তরুণদের কারা অস্ত্র দিচ্ছে, কারা অর্থ যোগাচ্ছে, তাদের তথ্য সম্মিলিতভাবে খুঁজে বের করার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
আরও হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া সাম্প্রতিক এক বক্তব্যের বিষয়ে এক সাংবাদিক জানতে চান, এ বিষয়ে সরকারের কাছে কোনো তথ্য আছে কি না।
জবাবে জঙ্গিবাদকে একটি বৈশ্বিক হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “একবার যখন ঘটেছে, এরা তো বসে থাকবে না, ক্রমাগত হুমকি দিচ্ছে।”
জঙ্গিবাদের বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে আওয়ামী লীগসহ সহযোগী সংগঠনগুলোকে দেশের প্রতিটি এলাকায় কার্যক্রম চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান শেখ হাসিনা। একইসঙ্গে গ্রাম পর্যায়ে সন্ত্রাসবিরোধী কমিটি গঠন এবং প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা রাখার কথাও বলেন তিনি।
মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটোরে একাদশ এশিয়া-ইউরোপ (আসেম) শীর্ষ সম্মেলনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে এই সংবাদ সম্মেলনে আসেন প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে তা সরাসরি প্রচার করা হয়।
গুলশানে দেশের নজিরবিহীন জঙ্গি হামলায় ১৭ বিদেশি নাগরিকসহ ২২ জন নিহত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেও এই প্রথম সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা তাকে প্রশ্ন করার সুযোগ পেলেন।
বাংলাদেশকে অর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্বে সন্মানের জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “একটার পর একটা ঘটনা ঘটিয়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা করেছে।
“কিন্তু গুলশানে এই ঘটনা ঘটার পর, বিদেশি হত্যার পর খুব স্বাভাবিকভাবে…এই আসেম আগেরবার মিলানে যখন হয়, তখন যে গলা উঁচু করে কথা বলতে পেরেছিলাম; আজকে সেখানে দেখা যাচ্ছে যে, আজকে বাংলাদেশেও যে ঘটনা পৃথিবীর অন্য দেশের একই ঘটনা। একই পর্যায়ে চলে গেছি।”
সম্মেলনে অন্যান্য দেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “অমরা এতদিন অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলাম। কিন্তু এটা এখন বিশ্বব্যাপী। উন্নত দেশগুলোতেও হচ্ছে। এখানে সহযোগিতা সকলকে সকলের করতে হবে। কোথায়, কীভাবে কারা মদদ দিচ্ছে সেটাই সবাইকে বলে এসেছি।
“অস্ত্র কোত্থেকে আসছে, কারা তৈরি করছে, অস্ত্রের ডিলার কে, প্রশিক্ষণ কারা দিচ্ছে, অর্থদাতা কে? যেখানে যেখানে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে সবাই মিলিতভাবে এ তথ্য সংগ্রহ করবে, সহযোগিতা করবে এটা আমরা বলেছি।”

Be the first to comment on "হামলার তদন্ত জানলে তাজ্জব হয়ে যাবেন: প্রধানমন্ত্রী"