শিরোনাম

চামড়া পাচারে সক্রিয় সিন্ডিকেট

নিউজ ডেস্ক :  বাংলাদেশ থেকে কোরবানির পশুর চামড়া পাচার হওয়া নিয়মিত ঘটনা। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে কাঁচা চামড়া সঙ্কটের সুযোগে চলতি বছরেও কোরবানির পশুর চামড়া পাচারে সিন্ডিকেট চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। চামড়ার ন্যায্য মূল্য নির্ধারনসহ কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে কোরবানি পশুর চামড়া একটা বড় অংশ পাচার হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতি বছরই ভালো মানের চামড়ার জন্য ব্যবসায়ীরা অপেক্ষা করেন কোরবানি ঈদের। চামড়া শিল্পের ৬৫ শংতাশ কাঁচা চামড়া কোরবানি ঈদে সংগৃহীত হয়ে থাকে। এ চামড়ার একটা বড় অংশ এ বছর পাচার যাবার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এ বছর ইতোমধ্যে (৫ সেপ্টেম্বর) ৩৩ লাখ পশু কোরবানির জন্য স্বাস্থ্যসম্মতভাবে মোটাতাজাকরণ করা হয়েছে। এ বছর কোরবানির জন্য সব মিলিয়ে এক কোটি চার লাখ পশু তৈরি আছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৯৬ লাখ ৩৫ হাজার।
তথ্য মতে, দুই বছরের বেশি সময় গরু জবাই বন্ধ থাকায় ভারতের ট্যানারিগুলোতে কাঁচা চামড়ার সংকট তৈরি হয়েছে। ভারতের বামতলা, কানপুর, চেন্নাই ও পাঞ্জাবে কয়েক হাজার ট্যানারি আছে। ২০১৪ সালের মে মাসে দেশটি বাংলাদেশে গরু পাচার বন্ধের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ভারতে গরু জবাই নিষিদ্ধ করে। এতে ট্যানারিগুলোতে কাঁচা চামড়ার সংকট তৈরি হতে থাকে। সম্প্রতি সঙ্কট কাটাতে কাঁচা চামড়া আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটি। আর এ সুযোগে আসন্ন ঈদুল আযহাকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে চামড়া পাচারকারী চক্র। অনেক ভারতীয় ট্যানারি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে অগ্রিম অর্থ দিয়ে কোরবানির পশুর চামড়া কিনতে আগেই চুক্তি করেছেন বলে জানা গেছে।
রাজধানীর বাইরের জেলাগুলো থেকেই আসে বিরাট অংশের কাঁচা চামড়া। পরিবহণ খরচ মেটানোর ভয়ে সীমান্ত অঞ্চলের চামড়া স্থানীয় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভারতে পাচার হয়ে যেতে পারে। এসব এলাকার জন্য ভারতে চামড়া বিক্রি করা তুলনামূলক সহজ।
এদিকে, নতুন ট্যানারি নির্মাণ, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ, কাঁচা চামড়া কিনতে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার অনিশ্চয়তায় কারণে ভারতে চামড়া পাচারের শঙ্কা করছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা। গেল বছরের কাঁচা চামড়া কিনতে সরকার ৪০০ কোটি টাকা দেয়। এ ঋণের অর্ধেকও পরিশোধ করতে সক্ষম হয়নি ট্যানারি মালিকরা। গত বছরের ঋন পরিশোধ করতে না পারায় নতুন করে ঋণ পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন অনেক ব্যবসায়ীর। এক্ষেত্রে ঋণ পুন:তফসিলের দাবি জানিয়েছে তারা। তার বলছেন, এমনটি না হলে চামড়া পাচারের আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের কাঁচা চামড়া সংগ্রহের সবচেয়ে বড় মৌসুম ঈদুল আযহা। কিন্তু গত বছরের ৩৩ শতাংশ চামড়া অবিক্রিত পড়ে আছে। এর আগে আমাদের চামড়া শিল্প এমন দুর্দিনে পড়েনি। তিনি আশা করেন, ব্যাংকগুলো মূলধন ঋণ না দিয়ে রপ্তানি ঋণ দিলে ব্যবসায়ী এবং এ খাত উপকৃত হবে।
এদিকে, হাজারীবাগের ট্যানারি সাভারে স্থানান্তর জটিলতা নিরসন না হবার এবারের ঈদে চামড়া সংগ্রহে ভাটা পড়ারও আশঙ্কা রয়েছে। হাজারীবাগে ১৯৪টি ট্যানারি রয়েছে। এসব ট্যানারিতে সারা বছর সংগ্রহকৃত চামড়ার ৬০ শতাংশই ঈদুল আযহায় সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে মাত্র ৩০টির মতো ট্যানারি সাভারে স্থানান্তর হয়েছে। অন্যদিকে, হাজারীবাগে চামড়া প্রবেশে সরকারি নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকায় এ বছর সংগ্রহ ও বাজারজাত করণ প্রক্রিয়ায় অনিশ্চিয়তা দেখা দিয়েছে।
এ সমস্যা সমাধানে আগামী তিন মাস হাজারীবাগে ট্যানারীগুলোর কার্যক্রম চালানো জন্য দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ।
এছাড়া ডলারের দরপতন ও মন্দা বাজার বিবেচনায় এ বছর গত বছরের চেয়ে ৪০ শতাংশ দাম কম নির্ধারণ করার প্রস্তাবনা রেখেছে ব্যবসায়ীরা। এতে করে বেশি দাম পাবার আশায় ভারতে চামড়া পাচারের আশঙ্কা আরো বেশি দেখা দিয়েছে। গেল বছর গত বছর চামড়ার সর্বনিম্ন প্রতি বর্গফুট ছিল চামড়া ভেদে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, এ বছরই চামড়া পাচারের আশঙ্কা রয়েছে। আমরা ন্যায্য মূল্য নির্ধারণের জন্য কাজ করছি। ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ এবং তা স্থানীয় পর্যায়ে নিশ্চিত করা না গেলে পার্শ্ববর্তী দেশে চামড়া পাচার হয়ে যাবে। তিনি আরো বলেন, ভারতে কাঁচা চামড়া সঙ্কটে পাচারকারী সিন্ডিকেটচক্র ভালো দর পাওয়ার আশায় এবার আগেই সক্রিয় হয়েছে। তারা বাংলাদেশের চামড়া সরবরাহকারীদের অনেকের সঙ্গে চামড়া সংগ্রহের চুক্তি সেরে ফেলেছে।
ব্যবসায়ী প্রস্তাবের ব্যাপারে এক বৈঠকে বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, চামড়া কেনার যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা অগ্রহণযোগ্য। এটি কোনোভাবেই মানা যাবে না। যদি অযৌক্তিক দাম নির্ধারণ করা হয়, তবে পাশের দেশে চামড়া পাচার হয়ে যাবে। তা কোনোভাবে ঠেকানো যাবে না। তাই চামড়া নিয়ে কোনও ধরনের সিন্ডিকেট হবে না, সিন্ডিকেট করতে দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্ব রেখে চামড়ার উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। যাতে কোন অবস্থাতেই প্রকৃত প্রাপকগণ উপযুক্ত মূল্য থেকে বঞ্চিত না হন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, চামড়া পাচার রোধে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে। সীমান্ত দিয়ে চামড়া পাচার রোধে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। প্রতিটি গেইট পয়েন্টে বিজিবিকে সতর্ক করা হয়েছে। দেশের ভিতরে সীমান্তমুখী সড়ক পথে পুলিশি চেকপোস্ট বসানো হবে। সীমান্তমুখী কোন চামড়াবাহী গাড়ি যেতে দেওয়া হবে না।

basic-bank

Be the first to comment on "চামড়া পাচারে সক্রিয় সিন্ডিকেট"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*