নিউজ ডেস্ক : বিশ দিন গড়ানোর পর একুশের দিনটির অপেক্ষায় রয়েছে একুশের বইমেলা;
একুশের দিনে পাঠকের ঢল নামার আশায় আছেন প্রকাশকরা। বইমেলার কাছেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সোমবার মধ্যরাত থেকে শুরু হবে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পালা, যেখান থেকে জনস্রোত বরাবরই যায় বইমেলার দিকে।
মঙ্গলবারের বইমেলার ফটক খুলবে সকাল ৮টায়, মেলা চলবে রাত সাড়ে ৮টা অবধি।
একুশের ভাষা আন্দোলন, মাতৃভাষার জন্য আত্মাহুতি দেওয়া বীর শহীদ আর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের নানা প্রেক্ষাপট, বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস ও রাজনীতির পালাবদলের নানা বইয়ের পসরা সাজিয়ে প্রস্তুত বাংলা একাডেমি ও বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি।
যদিও দেখা গেছে, নতুন প্রজন্ম সেভাবে বাংলা ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধের বইয়ের প্রতি আগ্রহী নয়।
জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি মাজহারুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রতি বছরই দেখি, তারা এ দিনে মুক্তিযুদ্ধ আর বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর রাজনীতির বইগুলো বেশি খোঁজেন। এদের মধ্যে তরুণরা কিন্তু বেশি। একুশের প্রথম প্রহরে পূর্বাপর চিত্রটি পাল্টে যাবে।”
একই অভিমত সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্সের কর্ণধার কামরুল হাসান শায়কেরও।
“আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের দিন আমরা ভীষণ হিমশিম খাই। এদিনের পাঠক মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই বেশি খুঁজে।”
তাম্রলিপি প্রকাশনীর কর্ণধার এ কে এম তারিকুল ইসলাম রণি বলেন, “মেলার শুরু থেকেই মুক্তিযুদ্ধের বই বেশ ভালো বিক্রি হচ্ছে। একুশে ফেব্রুয়ারিতে তরুণদের প্রধান ঝোঁক থাকবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে।”
এদিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন উপলক্ষে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো জোরদার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলা একাডেমির পরিচালক ও অমর একুশে গ্রন্থমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব জালাল আহমেদ।
তিনি বলেন, “মেলায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য বৃদ্ধির পাশাপাশি মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হচ্ছে। নিরাপত্তা নিয়ে আমরা ইতোমধ্যে বৈঠক করেছি। মেলার কোথাও যেন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখবে নিরাপত্তা বাহিনী। মেলাকে নির্বিঘ্ন করতে আমাদের পক্ষ থেকে সব ব্যবস্থাই নেওয়া হয়েছে।”
শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন উপলক্ষে বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে নানা কর্মসূচি রয়েছে। রাতে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার পর সকালে মেলার মূল মঞ্চে রয়েছে স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর। এতে সভাপতিত্ব করবেন কবি মোহাম্মদ সাদিক।
বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘ধর্মীয় বহুত্ববাদ : বাঙালি গৌরবময় উত্তরাধিকার’ শীর্ষক বক্তৃতানুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ড. আবদুল মমিন চৌধুরী। স্বাগত ভাষণ প্রদান করবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান। সভাপতিত্ব করবেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম।
সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
নতুন বইয়ের খবর
গ্রন্থমেলার ২০তম দিনে নতুন বই এসেছে ৯৪টি এবং ৩৮টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
নতুন বইগুলোর মধ্যে গল্প- ১৫টি, উপন্যাস-১৭টি, প্রবন্ধ-১টি, কবিতা -৩০টি, ছড়া-২টি, শিশুসাহিত্য- ২টি, জীবনী- ৫টি, মুক্তিযুদ্ধ -২টি, নাটক-১টি, ভ্রমণ- ১টি, সায়েন্স ফিকশন-১টি, অন্যান্য বিষয়ে ১৬টি বই এসেছে।
‘লীলাবতী’ ই-বুকে
প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ‘লীলাবতী’ এবার ই-বুক ভার্সনে নিয়ে এসেছে অনলাইন ই বুক লাইব্রেরি সেই বই ডটকম।
সোমবার বিকালে বাংলা একাডেমির সেই বই স্টলের সামনে ই বুকের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে এসেছিলেন হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী অভিনেত্রী-পরিচালক মেহের আফরোজ শাওন, তার দুই ছেলে নিষাদ হুমায়ূন ও নিনিত হুমায়ূন।
শাওন বলেন,“প্রবাসে হুমায়ূন ভক্তদের আফসোস আর থাকবে না। এবার তারা ই বুক আকারে হুমায়ূন আহমেদের একটি উপন্যাস পড়তে পারবে। হুমায়ূন আহমেদের অন্য জনপ্রিয় বইগুলো ই বুক আকারে আনা যায় কি না তার পরিকল্পনা চলছে।”
“তবে ই-বুকে নয়, হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য বা লেখার অন্যরকম গন্ধ টের পেতে হলে প্রিন্ট ভার্সন বইটিই কিনতে হবে। যতই ই বুক আসুক, প্রিন্ট ভার্সনের আবেদন কখনও হারিয়ে যাবে না,” বলেন তিনি।
মূল মঞ্চের আয়োজন
সোমবার বিকাল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘উন্নতমানের শিক্ষা : সামাজিক অগ্রগতির চাবিকাঠি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. হারুন-অর-রশিদ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।
মনজুর আহমেদ বলেন, “শিক্ষার মান ও সমাজপ্রগতি উভয়ই বহুমাত্রিক প্রপঞ্চ। দুটোর মিথস্ক্রিয়া অনেকাংশে বিশেষ পরিস্থিতি ও আবহ-নির্ভর। সবক্ষেত্রে দুটোর সংযোগ প্রত্যক্ষ বা সরাসরি নয় এবং তা গাণিতিক হিসাবে নিরূপণযোগ্য নয়। কিন্তু সামগ্রিকভাবে মানসম্পন্ন শিক্ষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য।”
আলোচকরা বলেন, শিক্ষাব্যবস্থায় অসাম্প্রদায়িক জীবনদর্শন ও মানবিক প্রত্যয়ের সংযোগ না ঘটলে তা দেশের গণমুখী উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হবে। এ বিষয়ে সরকার, শিক্ষা-কারিকুলাম প্রণয়ন কর্তৃপক্ষ এবং সর্বস্তরের নাগরিকদের সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি খুবই প্রয়োজন।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “সাক্ষরতার দিক দিয়ে আমরা অনেকটা অগ্রগতি অর্জন করলেও সামগ্রিকভাবে শিক্ষার মান নিশ্চিত করা যায়নি।”
তিন ধারার শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষায় বাণিজ্যিক তৎপরতা এবং সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির অনুপ্রবেশ শিক্ষাব্যবস্থাকে ‘হুমকির সম্মুখীন’ করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “এ বিষয়ে আশু ইতিবাচক পদক্ষেপ করা না গেলে প্রকৃত শিক্ষিত জাতি গঠনের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। ”
সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল লোপা খানের পরিচালনায় ‘আবৃত্তিশীলন’-এর বৃন্দ আবৃত্তি পরিবেশনা। এছাড়া আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, সায়েরা হাবীব, ঝর্ণা সরকার এবং তামান্না নীপা।

Be the first to comment on "একুশের অপেক্ষা বইমেলায়"