শিরোনাম

গরুর ট্রাকে লাইনম্যান দিয়ে পুলিশের চাঁদাবাজি

নিউজ ডেস্ক : জহুরুল ইসলাম কুষ্টিয়া থেকে দুই দিন আগে ১২টি গরু নিয়ে উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের পশুর হাটে এসেছেন। পথে অন্তত পাঁচটি স্থানে দেড় হাজার টাকা টোল (চাঁদা) দিতে হয়েছে তাঁকে। তবে সরাসরি পুলিশ নয়, তাদের হয়ে লাইনম্যানরা চাঁদা তুলছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরাও টাকা তুলছে। ট্রাকচালকরা তাঁদের কাছ থেকে ওই টাকা দেন, হাটে পৌঁছে গরুর ব্যাপারিরা তা পরিশোধ করেন। একই অভিযোগ করেছেন পাবনার সাঁথিয়া থেকে আসা ব্যবসায়ী ইদ্রিস আলী। তাঁরও এ বাবদ খরচ হয়েছে এক হাজার ৫০০ টাকা। রাজধানীর কয়েকটি পশুর হাট ঘুরে পুলিশের এই নীরব চাঁদাবাজির তথ্য মিলেছে। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার মহাসড়ক ও হাটের নিরাপত্তায় সন্তুষ্ট ব্যবসায়ীরা। হাটের পাশাপাশি রাজধানীর ফুটপাতেও দেদার চলছে চাঁদা আদায়। এখানেও পুলিশ লাইনম্যানদের দিয়ে অর্থ ওঠাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। চাঁদাবাজি বন্ধসহ অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড রুখতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা নানা কৌশল গ্রহণ করেছেন। মহাসড়কগুলোতে বসানো হয়েছে ইন্টারনেট প্রটোকল (আইপি) ক্যামেরা। ভ্রাম্যমাণ আদালতও মাঠে কাজ করছে। এর পরও চাঁদা আদায় চলছেই। তবে চাঁদাবাজি হচ্ছে—এ অভিযোগ মানতে নারাজ পুলিশ কর্মকর্তারা। তাঁরা বলছেন, এত নিরাপত্তার মধ্যে কেউ চাঁদাবাজি করতে পারে না। তবে দু-একটি স্থানে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার কথা স্বীকার করেছেন তাঁরা। হাইওয়ে রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক এম এ মালেক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চাঁদাবাজি রুখতে প্রত্যেক পুলিশ সদস্যকে এবার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন থানার ওসিকে আমি টেলিফোন করে বলে দিয়েছি, পুলিশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি বা অন্য কোনো অভিযোগের সত্যতা পেলে তাত্ক্ষণিক শাস্তি হবে। আমাদের লাইনম্যান বলে কিছু নেই। পুলিশের নাম ভাঙিয়ে টাকা আদায়কারীদের প্রতিরোধে সবার এগিয়ে আসা উচিত।’ তিনি বলেন, এবারের ঈদে কঠোর নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যানজট নিরসনেও পুলিশ কঠোর পরিশ্রম করছে। ঈদকে সামনে রেখে সব ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে গত সপ্তাহে পুলিশ-র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের নিয়ে বৈঠক করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সেখানে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ঢাকা জেলার আমিনবাজার, সাভার, নবীনগর ও বাইপাইল মোড়, গাজীপুর জেলার চান্দনা, মাওনা চৌরাস্তা, চন্দ্রা মোড়, নারায়ণগঞ্জ জেলার কাঁচপুর মোড়, গোলাকান্দাইল, টাঙ্গাইল জেলার এলেঙ্গা, পাকুলা ব্রিজ, মির্জাপুর, ধেরুয়া রেল ক্রসিং, গোড়াই স্কয়ার এবং কুমিল্লার দাউদকান্দি টোল প্লাজা, গৌরীপুর বাজার, চান্দিনা, আলেখার চর, পদুয়ার বাজার ও চৌদ্দগ্রাম বাজারের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আইপি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এর পরও চাঁদাবাজদের তত্পরতা থেমে নেই। উত্তরা, কমলাপুর ও খিলক্ষেত বনরূপা হাটে গিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গরু নিয়ে ঢাকায় আসার সময় পথে পথে টাকা দিতে হচ্ছে। দিনের চেয়ে রাতে চাঁদাবাজি বেশি হয়। কমলাপুর হাটে আসা ব্যবসায়ী আবদুস সালাম জানান, রাজশাহীর গোদাগাড়ী থেকে ১৫টি গরু এনেছেন তিনি। বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পাশ থেকে শুরু হয় চাঁদা আদায়। অন্তত ১০টি স্থানে তাঁকে টাকা দিতে হয়েছে। স্থানীয় সন্ত্রাসী, শাসক দলের নেতাকর্মী ও পুলিশের লাইনম্যানরা চাঁদা তুলছে। তিনি জানান, চাঁদাবাজরা কৌশলে ট্রাকচালকের কাছে এসে টাকা নিয়েই সটকে পড়ে। বঙ্গবন্ধু সেতুর দুই পাড়ে প্রতি ট্রাক থেকে ১৫০ থেকে ২০০, টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় ২০০, সাভার, আশুলিয়া ও আমিনবাজারে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। তবে রাস্তায় কঠোর নিরাপত্তা আছে। হাটের পরিবেশ বেশ ভালো। খিলক্ষেত বনরূপা হাটে আসা ব্যবসায়ী বোক্তার মিয়া জানান, কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় আসতে তাঁকে চাঁদা দিতে হয়েছে প্রায় দুই হাজার টাকা। একই হাটে যশোর থেকে এসেছেন ফিরোজ মিয়া। তিনি বলেন, ‘পাটুরিয়া ঘাটে যানজট এড়াতে লাইনম্যানদের আগে থেকেই টাকা দিয়ে রেখেছিলাম। ওরা পুলিশেরই লোক। ঘাটের কাছে আসামাত্রই আমাদের ট্রাক ফেরিতে তুলে দেওয়া হয়।’ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসার পথে আড়িয়াল খাঁ, ফরিদপুরের ভাঙ্গা, হাসারা, নিমতলী, কালীগঞ্জ নতুন রাস্তা ও পদ্মার দুই পারে টাকা গুনতে হচ্ছে। কমলাপুুরে গরুর হাটে কথা হয় রমজান ফকিরের সঙ্গে। তিনি জানান, মেঘনা নদী হয়ে ট্রলারে করে তিনি ৯টি গরু এনেছেন। মোক্তারপুর, পাগলাসহ কয়েকটি স্থানে তাঁকে চাঁদা গুনতে হয়েছে। পশু ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ঢাকার ফুটপাতেও নীরব চাঁদাবাজি চলছে। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে পুলিশ ও রাজনৈতিক দলের ক্যাডাররা। এখানেও পুলিশ লাইনম্যান বা সোর্স ব্যবহার করছে। বায়তুল মোকাররম, গুলিস্তান, মতিঝিল, উত্তরার জসীমউদ্দীন রোড থেকে আবদুল্লাহপুর, দক্ষিণখান ও উত্তরখান এলাকার ফুটপাত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দোকানপ্রতি ২০০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। গরুবাহী গাড়িতে চাঁদাবাজি হচ্ছে না : আইজিপি পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক বলেছেন, মহাসড়কে গরুবাহী গাড়িতে চাঁদাবাজি বা অন্য কোনো সমস্যা নেই। হাটে পর্যাপ্ত গরু রয়েছে। ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে ব্যবসা করছেন। প্রত্যেক জেলার এসপিকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আছে, কোথাও চাঁদাবাজি হলে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর গাবতলী গরুর হাট ও বাস টার্মিনালে নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিদর্শন শেষে আইজিপি এসব কথা বলেন। পরিদর্শনকালে আইজিপির কাছে গবাদি পশু ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা অভিযোগ করেন, মহাসড়কের পাশে বসানো কিছু অস্থায়ী হাটে জোর করে গরু-ছাগল নামিয়ে রাখা হচ্ছে। সমিতির সভাপতি মজিবুর রহমান বলেন, গাবতলী থেকে গবাদি পশু কিনে তা সিলেট ও চট্টগ্রামে নেওয়ার পথে কাঁচপুর, টঙ্গী, বিশ্বরোডসহ অস্থায়ীভাবে বসানো কয়েকটি হাটে জোর করে গরু নামিয়ে রাখা হচ্ছে। মহাসড়কের পাশে বসানো ওই সব হাটে গবাদি পশু নামাতে ব্যবসায়ীদের বাধ্য করা হচ্ছে। সমস্যার সমাধানে আইজিপি তখনই সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেন। মহাসড়কে যানজট আছে স্বীকার করে আইজিপি শহীদুল হক বলেন, ‘মোটামুটি শৃঙ্খলভাবে গাড়ি চলছে, পর্যাপ্ত পুলিশ আছে। নদীতে পানি বেশি থাকায় ফেরি পারাপারে একটু সমস্যা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সবাই মিলে তা সমাধানের চেষ্টা করছি।’ চাঁদাবাজি, ছিনতাই, অজ্ঞান ও মলম পার্টির তৎপরতা এবার নেই বললেই চলে, মন্তব্য করেন আইজিপি।

basic-bank

Be the first to comment on "গরুর ট্রাকে লাইনম্যান দিয়ে পুলিশের চাঁদাবাজি"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*