নিউজ ডেস্ক : জহিরুল ইসলাম কুষ্টিয়া থেকে তিনটি গরু নিয়ে এসেছেন ঢাকায়। দুটি দুদিন আগেই বিক্রি করেছেন। আর তৃতীয় গরু যেটি সবচেয়ে বড় সেটি বিক্রি করেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন তিনি। সোমবার খিলক্ষেত বনরুপা হাটে গরু ব্যবসায়ীর কান্নার দৃশ্য দেখছিলেন আসপাশের উৎসুক মানুষ। কাছে গিয়ে এর কারণ জানতে চাইলে আরো সজোরে কাঁদলেন তিনি। জানা গেলো গরু বিক্রি করে বড় ধরনের লোকসান হয়েছে তার। গত রাতে (রবিবার মধ্যরাতে) যে গরু দাম করেছে চার লাখ টাকা আজ সকাল থেকে সে গরু এক লাখ আশি হাজার টাকার উপর কেউ দামই বলেনি। বেচারা গরুর বেপারী না পারছে বিক্রি করতে না পারছে ফেরত নিতে। ঈদ শেষে এমন বড় গরু নিয়ে আরো মহা বিপাকে পড়বেন। সেই সাথে বড় গরু লালন পালনের খরচও নেহাত কম নয়। সবকিছু চিন্তা ভাবনা করে লোকসান দিয়ে হলেও গরুটি বিক্রি করেছেন তিনি। সর্বশেষ ভাগ্যবান ক্রেতা দুই লাখ পঁচিশ হাজার টাকায় কেনেন আগের রাতে চার লাখ টাকা দাম হওয়া গরুটি। ভাগ্যবান ক্রেতা কোন এলাকার তা অবশ্য জানা যায়নি।
গরু বিক্রেতা বার বার কান্নার সুরে বলছিল ‘‘ভাইরে কাল রাতিও একজন মহিলা বার বার টাকা নিয়া ঘুরছিল চার লাখ কইছিলো দেইনি। কি ভুল যে করিলাম’’
রাজধানীর গরুর হাটে বড় ছোট কিংবা বাজারি সব ধরনের গরু নিয়েই অনেকটা বিপাকে আছেন ব্যবসায়ীরা। গরুর দাম কম, কোন কোন বাজারে ক্রেতাও কম। কোন বাজারে আবার ক্রেতারা শুধুই ঘুরে ঘুরে দাম দেখছেন। ইতোমধ্যেই অনেকেই গরু কিনে নিয়েছেন। আর যারা বাকি আছে তারাও কেনার জন্য বাজার থেকে অন্য বাজারে ছুটছেন। তবে গরু কিনে অধিকাংশ ক্রেতার মুখেই স্বস্তির হাসি। শুধু হাসি নেই বিক্রেতার মুখে।
গত দুই দিন ধরে বাজার ঘুরে এবং ক্রেতা বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে সোমবার সকাল থেকেই অনেকটা কমতে থাকে গরুর দাম। এর কারন হিসেবে জানা গেছে রবিবার রাতে সকল বাজারে অনেক গরুর ট্রাক এসে পৌঁছেছে। যে সকল গরুর ট্রাক রাস্তায় বিভিন্ন জটে আটকে ছিলো প্রায় সবই রাতের মধ্যে ঢাকায় প্রবেশ করেছে। আর বাজারে পর্যাপ্ত গরু থাকার কারণে ক্রেতারা এক গরু দেখে ছুটছেন অন্য গরু দেখতে। শুক্রবার অনেকেই শুধু গরু দেখেছেন আর শনিবার কেউ দেখেছেন কেউ কিনেছেন। তবে দাম তখনো ক্রেতা বিক্রেতা উভয়ের নাগালের মধ্যেই ছিলো। যদিও ক্রেতাদের অভিযোগ ছিলো বিক্রেতারা গরুর দাম কমাচ্ছে না। এরপরও শনিবার অনেক হাটেই গরু বেচাকেনা ছিল জমজমাট। রবিবার সারাদিন এবং বিশেষ করে রাতে বেচাকেনাটা হয় অনেক বেশি। শেষ দিনে গরুর সংকট হতে পারে কিংবা ভালো ও পছন্দের গরু নাও পাওয়া যেতে পারে এমন আশঙ্কায় যারা হাটে প্রবেশ করেছেন অধিকাংশই গরু কিনেই ফিরেছেন। রবিবার রাতে মাজারি একটি গরু বিক্রি হয়েছে সত্তুর হাজার টাকায় পচাত্তর হাজার বা আশি হাজার টাকায়। অথচ সেই ধরনের গরুই সোমবার ষাট হাজারের বেশি দাম বলছে না ক্রেতারা। অনকেই বাধ্য হয়ে বিক্রি করেছেন। কেউ কেউ আশায় বুক বেধে আছেন ভালো দাম পাবেন সে আশায়।
গফরগাঁও থেকে আসা আব্দুল বিশ্বাস যিনি এক জোড়া গরুর একটি গত রাতে বিক্রি করেছেন ৮৫ হাজার টাকায় অথচ সাথের জোড়াটি আজ দাম হচ্ছে ৬০-৬২ হাজার টাকা। তিনি বলেন দুইটা গরুর রংও এক স্বাস্থ্যও এক তবুও দাম অনেক কম বলে। তবে তিনি এখনই গরু বিক্রি করবেন না। প্রয়োজনে ফেরত নেবেন সে কথাই শুনালেন।
সব গরু ব্যবসায়ীরা অবশ্য আব্দুল বিশ্বাসের মতো নয়। দিনাজপুর থেকে এসেছেন কতিপয় ব্যবসায়ী। তাদের সাথে কথা বলে জানা গেলো তারা গরু এনেছিলেন ১৮ টি ১৭ টি বিক্রি করেছেন। তাতে কিছু লাভও হয়েছে আর একটি গরু খুবই কম দাম হচ্ছে তবুও বিক্রি করে দিবেন।
শেরপুর থেকে আসা রহিম যিনি প্রত্যেক বছরই ঢাকায় কোরবানির জন্য গরু নিয়ে আসেন। এবারও তিনি গরু এনেছেন তুলেছেন আফতাব নগর হাটে। ১২ টি গরুর মধ্যে বিক্রি হয়েছে ৫টি। তিনি আশা করছেন বাকিগুলোও বিক্রি হবে। গরু ফেরত নেওয়ার ইচ্ছা তার নেই লোকসান হলেও ফেরত নিতে নারাজ তিনি। কারণ হিসেবে বলেন, এই গরু আনা নেয়া করা আবার দূরের পথ সেই সাখে পরবর্তীতে কতোদিন বাড়িতে লালন পালন করতে হয় তারও হিসেব নেই। আর প্রতি গরুতে লালন পালনে খরচও অনেক।
সব মিলিয়ে রাজধানীর পশুর হাট ঘুরে জানা গেলো কোরবানির ঈদের একদিন আগে বিভিন্ন পশুর হাটে গরুর দাম কমতে শুরু করেছে। অনেকটাই পানির দামে গরু!
এই কম দামের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন যারা এনেছেন বড় গরু। মাজারি বা ছোট ধরনের গরুতে খুব বেশি লোকসান হচ্ছে না তবে বড় গরুতে অনেক কম দাম বলছে ক্রেতারা।
গাবতলী পশুর হাটে সিরাজগঞ্জ থেকে গরু নিয়ে এসেছেন ব্যবসায়ী ইসমাইল। এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘‘বড় গরু দামই করতে চায় না। যা দাম কম, দাম শুনে কলিজাটা শুকিয়ে আসে। দুদিন আগে যে দামে গরু বিক্রি হয়েছিল আজ তার চেয়ে অনেক কম দাম বলছে ক্রেতারা।”
গাবতলী হাট থেকে গরু কিনে হাসিখুশি মনে ফিরছিলেন রেজাউল করিম। কথা বলে জানা গেলো খুশির কারণ। গত রাতে একটি গরু কিনেছেন ৯০ হাজার টাকায় আর আজ দুপুরে একই সাইজের গরু পেয়েছেন ৬৫ হাজার টাকায়। খুশির সুরে জানালেন ভাই দুইটায় ‘‘ব্যালেন্স’’ হইছে এক লাখ পঞ্চান্ন বলেই হাসি।
বিভিন্ন হাটে হাট পরিচালনা কমিটি সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সবাই অতন্ত্য আনন্দের সাথে গরু কিনছেন। তবে দাম কমেছে সেটাও জানালেন তারা।
বিভিন্ন হাটে দেখা গেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে। বিভিন্ন হাটে কন্ট্রোল রুম খুলে সেখানেও দায়িত্ব পালন করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
শুধু কি গরু খাসির দামও কমেছে। অসংখ্য বিক্রেতারা খাসির রশি ধরে শুধু দাড়িয়ে আছেন। কেউ কেউ দাম করছেন তবে দামটা মনের মতো হচ্ছে না তাই বিক্রি করছেন না বিক্রেতারা। তবে খাসি কিনতে আসা ক্রেতারা বলছেন খাসির যে দাম চাচ্ছে তাতে গরুই কেনা যাবে! খাসির দামে গরু! কথা শুনে বিষয়টি জানতে চাইলে আফজান ভূইয়া নামক ক্রেতা জানান, একটি খাসি দাম চেয়েছে ৫০ হাজার টাকা আরেকটি খাসি দাম চেয়েছে ৩৫ হাজার টাকা। কি দাম বলবো আপনিই বলেন? অনেকটা পাল্টা প্রশ্নই করে বসলেন তিনি। তবে বিক্রেতারা বলছেন খাসিতে খাসিতে দামের পার্থ্যক হয়, দাম দেবে খাসি দেখে। মাজারি খাসি ৭-১০ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
এদিকে, রাজধানীতে সকাল থেকেই বিভিন্ন জায়গায় বৃষ্টি হয়েছে। কখনো বৃষ্টি থেমে গেলেও আবার কিছুক্ষন পরই আসছে বৃষ্টি। বৃষ্টির ক্রেতা বিক্রেতারা উভয়ের পড়েছেন সমস্যায়।
রোদ বৃষ্টির খেলা তবুও পশুর হাটে মানুষের মেলা। ক্রেতারা আসছেন পশু কিনছেন এবং যাচ্ছেন। পশুর বাজারে দাম কম কিংবা বেশি তবুও বেচাকেনা চলছে হরদম। কেননা, কালই যে ঈদ। যেভাবেই হওক আজই পশু কিনতে হবে সাধ্যের মধ্যে সবচেয়ে ভালোটি।

Be the first to comment on "গরুর দাম কম, বিক্রেতারা হতাশ"