নিউজ ডেস্ক ॥ যুদ্ধের শুরুতে নড়াইল অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তেমন কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না। তবু প্রবল দেশপ্রেম ও দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়েই তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন শত্রুর বিরুদ্ধে। নড়াইল জুড়ে যখন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের তান্ডব, তখন তাদের প্রাথমিক প্রতিরোধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন নড়াইলের কালিয়ার চাঁচুড়ি ইউনিয়নের দাদনতলা গ্রামের আব্দুল জলিল মোল্যা। ঝুঁকি নিয়ে হাতবোমা তৈরি করে সরবরাহ করেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের। আর ১৯৭১ সালের এপ্রিলে কালিয়ার একটি রাজাকার ক্যাম্পে বোমা নিক্ষেপের সময় বিস্ফোরণে হারিয়েছেন দুহাত ও বাম চোখ। অথচ দেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৬ বছরেও মেলেনি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি। যুদ্ধাহত এ মানুষকে তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৩ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক চিঠি দেন। ওই চিঠিতে তিনি তার প্রতি সমবেদনাও জানান। একই সঙ্গে তার জন্য তত্কালীন নড়াইল মহকুমা প্রশাসকের কাছে ১ হাজার টাকা প্রেরণ করেন। কিন্তু ওই পর্যন্তই। দেশ স্বাধীন হলেও আজো তিনি তার স্বীকৃতি পাননি। সর্বশেষ মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির কাছে অনলাইনে আবেদন করতে না পারায় নাম ওঠেনি এ তালিকায়ও। ৭২ বছর বয়সী আব্দুল জলিল মোল্যা জানান, যুদ্ধের সময় নড়াইলের কালিয়া শহরের পাশে একটি একতলা পরিত্যক্ত বাড়িতে রাজাকার ক্যাম্প ছিল। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে নোয়াক গ্রামের লিয়াকত, নড়াইলের খড়রিয়া গ্রামের আশরাফ ও কালামসহ বেশ কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে রাত ৮টার দিকে ওই ক্যাম্পের রাজাকারদের লক্ষ্য করে দুটি হাত বোমা নিক্ষেপ করেন। এর পর কাঁধে থাকা ব্যাগ থেকে বোমা বের করার সময় দুটি বোমা বিস্ফোরিত হলে তার দুহাত ও বাম চোখ নষ্ট হয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমার সাহসিকতার জন্য ১ হাজার টাকা প্রদান করেন। কিন্তু এর পর বেশ কয়েকবার মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেও পারিনি।’ মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম ওঠাতে অনেকে তার কাছে টাকাও চেয়েছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘নিজে কাজ করতে পারি না। ভিটেটুকু ছাড়া আর কোনো জমিও নেই। চার ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে সারা জীবন অনেক কষ্টে সংসার চালিয়েছি। সর্বশেষ ৭ ফেব্রুয়ারি নড়াইলের কালিয়া উপজেলার প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির কাছে নাম জমা দিয়েছি। কিন্তু কমিটির নেতারা বলেছেন, অনলাইনে দরখাস্ত না করায় যাচাই-বাছাই করা যাচ্ছে না। অনলাইনে দরখাস্ত করার বিষয়টি আমার জানা ছিল না। নড়াইলের কালিয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এমদাদুল হক মোল্যা জানান, যাচাই-বাছাইয়ের শেষ দিন ৭ ফেব্রুয়ারি তার কাগজপত্র জমা নেয়া হয়েছে। কিন্তু অনলাইনে আবেদন না করায় তার নাম জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে পাঠানো যাচ্ছে না। অনলকালিয়া উপজেলার চাঁচুড়ি-পুরুলিয়া অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক ও সমাজসেবক কাওসার আহম্মেদ আমাদের নড়াইল জেলা প্রতিনিধি উজ্জ্বল রায়কে জানান, ‘মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে জলিলের হাতবোমা ছিল আমাদের প্রধান অস্ত্র। এ সময় চাঁচুড়ি-পুরুলিয়া অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে বলতে ছিল মাত্র একটি রাইফেল। ওই সময়ে জলিল খুব ঝুঁকি নিয়ে বোমা বানিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সরবরাহ করেছেন। নিজেও রাজাকারদের বিরুদ্ধে বোমা নিক্ষেপ করেছেন। তার নাম মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভুক্ত না হওয়া খুব দুঃখজনক।’ কাাইনে দরখাস্ত করেননি, এমন ২৫ জনের নাম রয়েছে। নতুন করে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের অনুমতি পেলে এদের নাম যাচাই-বাছাইয়ের আওতায় আসবে।
স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও স্বীকৃতি মেলেনি নড়াইলের যুদ্ধাহত পঙ্গু জলিলের
স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও স্বীকৃতি মেলেনি নড়াইলের যুদ্ধাহত পঙ্গু জলিলের
Be the first to comment on "স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও স্বীকৃতি মেলেনি নড়াইলের যুদ্ধাহত পঙ্গু জলিলের"