নিউজ ডেস্ক: গুপ্তহত্যায় বিএনপি-জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘উস্কানিমূলক ও অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যায়িত করে পাল্টা অভিযোগ এনেছে বিএনপি।
দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জায়গার ইঙ্গিত’ না থাকলে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা ‘লাপাত্তা হয়ে যেতে পারত না’।
বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর গতকালের সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য উসকানিমমূলক, অনভিপ্রেত, অগ্রহণযোগ্য। ওই বক্তব্য অসত্য, বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপ্রসূত।”
সেই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘রাজনৈতিক শিষ্ঠাচারবিরোধী ও সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ বিপন্নকারী’ হিসেবেও আখ্যায়িত করেন এই বিএনপি নেতা।
“এসব নারকীয় ঘটনার ন্যূনতম কোনো হদিস বের করতে না পেরে চরমভাবে ব্যর্থ হয়ে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের ওপর এগুলোর দায় চাপাচ্ছেন। আমরা মনে করি, এ সমস্ত নিঁখুত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়া এবং সংঘটনকারীদের লাপাত্তা হয়ে যাওয়ার ঘটনা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জায়গা, অর্থাৎ রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনদের ইংগিত না থাকলে কোনোভাবেই সম্ভব হতে পারে না।”
আগের দিন গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অন্য অনেক বিষয়ের সঙ্গে সাম্প্রতিক গুপ্তহত্যার বিষয়েও কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে একজন সাংবাদিক বলেন, বিএনপি-জামায়াতের ইন্ধানেই গুপ্তহত্যা হচ্ছে বলে যে অভিযোগ সরকারপ্রধান করে আসছেন, তা ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে নাগরিক সমাজের কারও কারও ধারণা।
“তারা মনে করেন, এই কারণে জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্তরা রক্ষা পেয়ে যাচ্ছে। পুলিশ সব সময় রাজনৈতিক অপরাধী খুঁজতে থাকে, আসল অপরাধীরা পার পেয়ে যায়।”
এ জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, “আমরা যখন কথা বলি, মনে রেখে দেবেন; কোনো অমূলক কথা বলি না। একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না, আমি হেড অফ দি গভার্নমেন্ট। আমার কাছে নিশ্চয়ই তথ্য আছে।
“তদন্তের স্বার্থে সব কথা হয়তো প্রচার করা যাবে না, বলা যাবে না, প্রকাশ করা যাবে না। কিন্তু সূত্রটা জানা যায়। আমরা সূত্র ধরেই কথা বলি।”
যারা সরকারের অভিযোগকে ‘রাজনৈতিক বক্তব্য’ মনে করেন, তারা যদি জানেন যে সন্ত্রাসী আসলে কারা, তাহলে সেই তথ্যটি সরকারকে দিতে বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানাতেই বৃহস্পতিবার নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসেন মির্জা ফখরুল।
তিনি বলেন, “আমরা মনে করি, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে রাষ্ট্র ও সমাজে বিভেদ-বিভাজনের পরিসর আরও বিস্তৃত হবে, জঙ্গিবাদ উৎসাহিত হয়ে আরও বেশি সংগঠিত ও তৎপরত হবে।”
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ‘জঙ্গিবাদকে রেহাই দেওয়ার শামিল’ মন্তব্য করে ফখরুল বলেন, “আমি প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্য দৃঢ় প্রত্যয় সহকারে প্রত্যাখ্যান করছি এবং তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।”
সরকারের উদ্দেশে বিএনপি মহাসচিব বলেন, “সরকারকে বলব, এভাবে শুধু নিজেদের ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য বিরোধী দলের ওপর দোষারোপ না করে সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের বের করে আনুন, সত্য উদঘাটন করুন, তাদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসুন।”
রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তথ্য থাকার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন, তার প্রতিক্রিয়ায় মির্জা ফখরুল বলেন, “এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলেই প্রথম আক্রমণটা করেন বিএনপিকে। গুলশানে যখন ইতালীয় নাগরিক গুপ্তহত্যার শিকার হলেন, তার একদিন পর যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে থেকে প্রধানমন্ত্রী বললেন এটার সঙ্গে বিএনপি জড়িত। কোনো রকম তথ্য-উপাত্ত ও তদন্ত ছাড়াই তিনি প্রথমে বলে দিলেন এর সঙ্গে বিএনপি জড়িত।”
“সরকারের প্রধান যখন বলে দেন যে এরাই জড়িত, তখন সমস্ত তদন্তের ধারাটা সেদিকে চলে যায়, অর্থাৎ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের আর অবকাশ থাকে না। এটা প্রধানমন্ত্রী করেন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে। কারণ তিনি জানেন, এটা করলেই তদন্তের বিষয়গুলো অন্যদিকে চলে যাবে।”
সারা বিশ্বে এখন বাংলাদেশের গুপ্তহত্যা ও জঙ্গি কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী ‘জনগণের দৃষ্টি, আন্তর্জাতিক দৃষ্টি ভিন্ন পথে পরিচালিত করতে’ আবারও বিএনপিকেই ‘দোষারোপ’ শুরু করেছেন বলে মন্তব্য করেন এই বিএনপি নেতা।
তিনি প্রশ্ন করেন, “সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যদি এতোই তথ্য থাকে, তাহলে নাটোরে উপজেলা চেয়ারম্যান নূর হোসেন বাবু, সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের কোনো তথ্য পেলেন না কেন? বিডিআর হত্যাকাণ্ডের তথ্য কেন ঘটার আগে প্রধানমন্ত্রী পেলেন না?”
‘ক্রসফায়ারে কেন?’
ফখরুল বলেন, দেশে ‘ক্রসফায়ার ও বিচারবহির্ভূত হত্যার’ বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে সাম্প্রতিক জঙ্গিদের কাজের যোগাযোগ তিনি খুঁজে পাচ্ছেন।
“বিএনপি নেতা নুরুল ইসলাম, যুবদল নেতা গামা, উপজেলা চেয়ারম্যান নূর হোসেন বাবুর হত্যাকারীদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমা করা হয়েছে, তাতে এটাই প্রমাণিত হয়, হত্যাকারী, অনাচারকারী, হাঙ্গামাকারীরা বর্তমান ক্ষমতাসীনদের দ্বারা আর্শিবাদ লাভ করে আছেন। জঙ্গিবাদ… সরকারি আচরণেই এর প্রতিফলন।”
গত কয়েক দিনে কথিত বন্দুকযুদ্ধে সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের আসামি কয়েকজন জেএমবি সদস্যের নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়েও ফখরুল প্রশ্ন তোলেন।
“এ থেকে আমরা কী ধারণা নিতে পারি? যারা জড়িত, তাদের গ্রেপ্তার করা হয়, তাদেরকেই হত্যা করে ফেলা হচ্ছে কেন। তাদেরকে ক্রসফায়ারের নাম করে হত্যা করে ফেলা হচ্ছে কেন? কারণটা কী? কোথায় সমস্যাটা।
“এটা কী এখানে সমস্যা যে তাদেরকে বিচারের আওতায় আনলে সত্য উদঘাটিত হয়ে যাবে- সেজন্য তাদের ক্রসফায়ারের নাম করে হত্যা করা হচ্ছে?”
অন্যদের মধ্যে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, সহ সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদ, অনিন্দ্র ইসলাম অমিত, কেন্দ্রীয় নেতা আসাদুল করিম শাহিন সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

Be the first to comment on "রাষ্ট্রের ‘সর্বোচ্চ জায়গার ইঙ্গিত’ দেখছে বিএনপি"