নিউজ ডেস্ক: দেশের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল, মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে যে দল, জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান যে দলের সঙ্গে জন্মলগ্ন থেকেই আত্মিক সম্পর্কে জড়িত ছিলেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন সেই আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় কাউন্সিল বা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১০ ও ১১ জুলাই। এর মধ্যে জাতীয় কাউন্সিলের তারিখ কয়েক দফা পিছিয়েছে। আশা করা হচ্ছে, এবার ঘোষিত তারিখেই কাউন্সিল হবে।
কাউন্সিল সম্পন্ন করার জন্য আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চেয়ারম্যান এবং সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে সদস্য সচিব করে ৬৯ সদস্যবিশিষ্ট প্রস্তুতি কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়াও গঠন করা হয়েছে ১১টি উপ-কমিটি।
গত ১১ এপ্রিল জাতীয় কাউন্সিলের তারিখ ও প্রস্তুতি কমিটি ঘোষণা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সমে¥লনে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের কাউন্সিল মানেই দেশকে নতুন কিছু দেওয়া। এ দলের কাউন্সিল থেকে নতুন ইতিহাস তৈরি হয়। নতুন নেতৃত্ব তৈরি হয়। এবারের কাউন্সিলে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
সৈয়দ আশরাফ আরও বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের কাউন্সিল একটি বিশাল ব্যাপার। আওয়ামী লীগের কাউন্সিল মানেই বাংলাদেশের অস্তিত্ব, ইতিহাস। অতীতের কাউন্সিলগুলোর মতো এবারের কাউন্সিলও বাংলাদেশের অস্তিত্বের স্বার্থে, ইতিহাসের ধারাবহিকতার স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। উপযোগী নেতৃত্ব নির্বাচন হবে।’
সৈয়দ আশরাফ আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় প্রধান শীর্ষ নেতা। তিনি সজ্জন এবং মিতভাষী। বাগাড়ম্বর করা যেসব রাজনীতিবিদদের বৈশিষ্ট্য সৈয়দ আশরাফ তাদের মধ্যে পড়েন না। তার কথাবার্তা সে জন্যই রাজনৈতিক মহলে আলাদা মূল্য বহন করে। দলের কাউন্সিল সামনে রেখে তিনি যেসব কথা বলেছেন, সেগুলো কথার কথা বলে উড়িয়ে না দিয়ে আমরা সেগুলো মনে রাখব এবং কাউন্সিল শেষে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করব কাউন্সিলে তার কথার যথাযথ প্রতিফলন ঘটেছে কি না। আমরা দেখব, আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় কাউন্সিল দেশকে নতুন কী দেয়, নতুন কোন ইতিহাস তৈরি হয়, কেমন নতুন নেতৃত্ব উপহার পাওয়া যায়।
আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল যে একটি বিশাল ব্যাপার সেটা নিয়ে বিতর্ক করার কিছু নেই। আওয়ামী লীগের মতো বিপুল জনপ্রিয় ও গণভিত্তিসম্পন্ন দলের এবারের কাউন্সিল উপলক্ষেও আয়োজনের বিশালত্বে কোনো ঘাটতি থাকবে না, এটাই স্বাভাবিক। আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায় আছে। দলের কাণ্ডারি হিসেবে আছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন আওয়ামী লীগের সভাপতি তখন তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয় অর্জন করেছিলো দলটি। তখনই আওয়ামী লীগ দেশের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলের মর্যাদা ও স্বীকৃতি লাভ করেছিল সাধারণ মানুষের ভোটের মাধ্যমে। সত্তরের নির্বাচনের ঐতিহাসিক বিজয় ছিল আওয়ামী লীগের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এর মধ্য দিয়ে দলটি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার নৈতিক ও আইনগত ভিত্তি অর্জন করেছিল। ইতিহাসের অংশ নয়, ইতিহাস তৈরিতে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছিল আওয়ামী লীগ।
স্বাধীনতা লাভের পর অল্প সময়ের মধ্যেই আওয়ামী লীগের ওপর চরম বিপর্যয় নেমে আসে। শাসক দল হিসেবে সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে এগিয়ে চলছিল দলটি। সেটা কোনো অস্বাভাবিক ঘটনাও ছিল না। দুনিয়ার কোনো দেশেই কোনো ক্ষমতাসীন দলকে যেমন শতভাগ সফল বলা যায় না তেমনি কোনো দল শতভাগ ব্যর্থও হয় না। কারও সাফল্যের পাল্লা ভারী হয়, কারও ব্যর্থতার পাল্লা।
যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের শাসনকালটা কোনোভাবেই ভালো সময় ছিল না। ক্ষমতাসীন হয়ে ফুল বিছানো পথে হাঁটার সুযোগ কিংবা সৌভাগ্য আওয়ামী লীগের হয়নি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিরোধী ও বৈরী শক্তিকে মোকাবেলা করে, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির গোপন-প্রকাশ্য ষড়যন্ত্র, অন্তর্ঘাত-নাশকতা মোকাবেলা করে জাতীয় পুনর্গঠনের কঠিন কাজটি তখন আওয়ামী লীগকে করতে হচ্ছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে।
কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে ইতিহাসের চাকা উল্টোপথে ঘোরানোর অপচেষ্টা শুরু হয়। বঙ্গবন্ধুর পর তার চার রাজনৈতিক সহযোগীকে জেলখানার ভিতর হত্যার ফলে চরম নেতৃত্ব সংকটে পড়ে আওয়ামী লীগ। দলটি আবার কোনো দিন একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে, রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে পারবে– এসব অনেকের কাছেই ছিল অবিশ্বাস্য।
পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে কেউ কেউ বরং এমনটাও মনে করতেন যে, আওয়ামী লীগের পরিণতি হবে মুসলিম লীগের মতো। পকিস্তান প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছিল মুসলিম লীগ কিন্তু পরে পাকিস্তানের রাজনীতিতে দলটি ক্রমাগতই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই এবং মুক্তিযুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ। স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এএইচ এম কামারুজ্জামান এবং মনসুর আলীর মতো নেতাদের হত্যা করে নেতৃত্বের যে শূণ্যতা তৈরি করা হয়েছিল তা পূরণ করা কীভাবে সম্ভব হবে তা নিয়ে শঙ্কা ও সংশয় অনেকের মধ্যেই ছিল।
অবশ্য কালচক্রে সব শঙ্কা, সব সংশয় দূর হয়েছে। আওয়ামী লীগের পুনরুত্থানের সম্ভাবনা নিয়ে যারা সন্দেহ পোষণ করতেন তাদের সব অনুমান ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ভুল প্রমাণ করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরই কন্যা শেখ হাসিনা। বিস্তারিত ব্যাখ্যায় না গিয়ে সংক্ষেপে শুধু এটাই বলা যায় যে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নবজীবন লাভ করেছে, শক্তি সঞ্চয় করেছে, ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এবং জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন। শেখ মুজিবের নেতৃত্ব দলকে যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্ব সে উচ্চতার মাত্রা কমায়নি। বরং অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে আওয়ামী লীগ এখন দৃশ্যত ভালো অবস্থায় আছে।
আমাদের দেশে একবার যে দল নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় যায় দ্বিতীয়বার তাদের জয়ী হওয়ার রেকর্ড নেই। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দেশের রাজনীতির ইতিহাসে নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে। পরপর দুইবার নির্বাচিত হয়ে ধারাবাহিকভাবে দেশ শাসন করছে আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন শেখ হাসিনা। যদিও দ্বিতীয় দফার নির্বাচনটি নিয়ে দেশে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। এই নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেনি। ১৫৩ জন সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।
এটা প্রচলিত গণতান্ত্রিক রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কিন্তু এ রকম একটি বিতর্কিত ও অশুদ্ধ নির্বাচনের ভালো কোনো বিকল্পও ছিল না। ঐ নির্বাচন না হলে অনির্বাচিত কারও ক্ষমতা গ্রহণের পথ প্রশস্ত হত। গণতান্ত্রিক শাসনের ধারাবাহিকতা ক্ষুণ্ন হত। শেখ হাসিনা সেটা হতে দেননি। নির্বাচন একেবারে না হওয়ার চেয়ে একটি মন্দ নির্বাচনকে বেছে নেওয়া হয়েছে। ঐ নির্বাচন দেশের মানুষের কাে যে তেমন অগ্রহণযোগ্য হয়নি তার প্রমাণ শেখ হাসিনার সরকার এখনও ক্ষমতায় আছেন।
রাজনীতিক পণ্ডিতরা ভেবেছিলেন ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর শেখ হাসিনা বড়জোর মাস কয়েক ক্ষমতায় থাকতে পারবেন। নতুন আগাম নির্বাচনের জন্য মানুষ পথে নেমে আসবে। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধপক্ষ ক্রমাগত প্রচার করছে যে, দেশে কার্যত কোনো গণতন্ত্র নেই এবং এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আওয়ামী লীগকে মোকাবেলা করার অক্ষমতা থেকেই হয়তো এ ধরনের প্রচারণা।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ৬৭ বছরের ইতিহাসে এখনকার সময়টাই সম্ভবত বেশি অনুকূল। টানা ৭ বছর ধরে ক্ষমতায় আছে, ক্ষমতার বর্তমান মেয়াদ পূর্ণ করতে তাদের খুব বেশি বেগ পেতে হবে বলে অনেকেই মনে করেন না। আওয়ামী লীগ তরফে এই ধারণা চালু আছে যে, শুধু এই মেয়াদ নয়, পরের মেয়াদেও দেশ শাসন করবে আওয়ামী লীগ। অর্থাৎ ২০২৪ সালের আগে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করা যাবে না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবাষির্কী এবং স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপনের সময় শেখ হাসিনাই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিকে নেতৃত্ব দিবেন।
এগুলোকে কেউ আওয়ামী লীগের অতি আশা কিংবা দুরাশা বলে মনে করতে পারেন। তবে পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত যা দেখা যাচ্ছে তা আওয়ামী লীগের স্বপ্ন পূরণের পক্ষেই।
তবে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। আওয়ামী লীগ যেহেতু সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক দল। সেহেতু সাধারণ মানুষের মধ্যে দল সম্পর্কে এখনকার ক্রিয়া- প্রতিক্রিয়াও বিবেচনায় নিতে হবে। দলের মধ্যে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে সেটা বুঝতে হবে। আসন্ন জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে যদি দলের ভেতর যেসব সমস্যা তৈরি হয়ছে সেগুলো দূর করার উপযুক্ত কার্যপদ্ধতি গ্রহণ করা হয় তাহলে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়েই দেখা দিবে।
তবে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে শেখ হাসিনাকে এটা বুঝতে হবে যে, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের এক ধরনের স্ফীতি এখন বাইরে থেকে দেখা গেলেও ভেতরে ভেতরে তার অনেকটাই ফাঁপা। ক্ষমতায় থাকার কারণে দলের শরীরে কিছুটা মেদ জমেছে। এটা সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ নয়। অভ্যন্তরীন দুর্বলতাগুলো প্রকট হয়ে বাইরে প্রকাশ না পেলেও দুর্বলতা যে আছে তা মেনে নিতে হবে এবং সেগুলো দূর করার জন্য আন্তরিকভাবে উদ্যোগী হতে হবে।
দলের ভেতর কলহ-কোন্দল কতটা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে তার কিছুটা টের পাওয়া যাচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে আওয়ামী লীগ যেভাবে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে তা এক কথায় ভয়াবহ। আওয়ামী লীগে শৃংখলা বলে কিছু আছে বলে মনে হচ্ছে না। দলের চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে পড়েছে। প্রায় সব পর্যায়েই নেতৃত্ব কার্যত বহুধাবিভক্ত এবং বিশৃঙ্খল। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করার যে প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, দল থেকে বহিষ্কারের হুমকিও যেভাবে অগ্রাহ্য করা হচ্ছে তা যদি দমন বা নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তাহলে ভবিষ্যতের জন্য বড় বিপদ অপেক্ষা করছে।
নতুন ইতিহাস তৈরি করতে হলে এবং দেশকে নতুন কিছু দিতে হলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক পর্যায়ে অনেক ঘষামাজা যেমন করতে হবে তেমনি মতাদর্শগত চর্চাও দলের মধ্যে বাড়াতে হবে। দেশের সামনে এখন বড় বিপদ উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের উত্থান। এই বিপদ মোকাবেলার জন্য আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের রাজনৈতিক ও আদর্শগত যে প্রস্তুতি দরকার তা আছে কি?
আওয়ামী লীগ তার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপিকে কোণঠাসা করে রেখেছে। ভুল রাজনীতির খেসারত দিচ্ছে বিএনপি। হামলা-মামলায় জর্জরিত বিএনপি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না। কিন্তু এ অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। নিজের যোগ্যতায় না হলেও আওয়ামী লীগ বা সরকারের ভুল-ভ্রান্তি যে এক সময় বিএনপিকে পুনরুজ্জীবনের সুযোগ করে দেবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের দেশে বিরোধী দলকে শক্তি যোগায় সরকারি দলের ব্যর্থতা, ভুল, গণবিচ্ছিন্নতা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন সদ্যঘোষিত দলের ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের নেতারা। প্রধানমন্ত্রী ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য নেতা-কর্মীদের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেছেন, ‘নেতৃত্ব শুধু বক্তৃতা দেওয়ার জন্য নয়। জনগণের প্রতি দায়িত্ব পালন এবং সংগঠনকে শক্তিশালী করাও নেতৃত্বের কাজ।’
একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আপনাদের দলের প্রতীক নিয়ে জনগণের কাছে প্রতিনিয়ত যেতে হবে। জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। তাদের বলতে হবে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাবে এবং জনগণ শান্তি ও সমৃদ্ধির সঙ্গে বসবাস করতে পারবে।’
সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী এই বিপদ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে যথাযথ ভূমিকা পালনে দলের নবনির্বাচিত নেতাদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। নগরীর সর্বত্র সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সদাসতর্ক থাকা এবং যে কোনো স্থানে এমন কোনো দুর্বৃত্তের সন্ধান পেলে দ্রুত আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে জানানোর আহবানও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতির নির্দেশনাগুলো যদি সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা যথাযথভাবে পালন করেন তাহলে দলের মধ্যে যে দুর্বলতাগুলো তৈরি হয়েছে তা কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে। আওয়ামী লীগ যে দেশের একটি বড় রাজনৈতিক দল সেটা মানুষ বুঝতে পারে তারা নিজেদের মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে। দলের নিয়মিত সাংগঠনিক তৎপরতা নেই। নিয়মিত সম্মেলন যেমন হয় না তেমনি হয় না কমিটির সভা। নেতৃত্ব নির্বাচনে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুসরণ করা হয় না।
মানুষের সঙ্গে দলগতভাবে কোনো যোগাযোগ নেই। দল ক্ষমতায় থাকায় মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক নেতা-কর্মী আখের গুছিয়ে নিচ্ছেন। বেশিরভাগই হচ্ছেন বঞ্চিত। ফলে দলের মধ্যেই খাওয়া-পাওয়া গ্রুপ এবং না-খাওয়া না-পাওয়া গ্রুপের দ্বন্দ্ব-বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। দলের আদর্শবাদী ও ত্যাগী নেতা-কর্মীরা হতাশ হয়ে রাজনীতি থেকেই দূরে সরে যাচ্ছেন। স্থানীয় পর্যায়ের কিছু কিছু নেতা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে বড় রকমের বিরূপতা তৈরি হয়েছে।
মানুষের সব আস্থা-বিশ্বাস-ভরসা শেখ হাসিনার ওপর। কিন্তু আওয়ামী নৌকার সব ভার শেখ হাসিনার ওপর চাপিয়ে দিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষে নির্ভার থাকা কতটা যুক্তিযুক্ত? আসন্ন কাউন্সিল দলের রোগ নির্ণয় ও নিরাময়ের কী ব্যবস্থাপত্র দেওয়া হয় সেটাই এখন দেখার বিষয়!
লেখক: বিভুরঞ্জন সরকার, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Be the first to comment on "হাসিনার ওপর সব ভার, আওয়ামী লীগ কতটা নির্ভার"