রাশেদুল ইসলাম, স্টাফ রিপোর্টার: অতীতে ইংরেজরা এদেশে যেমন ধনরতেœর লোভে এসেছিলেন, তেমনি তারা এদেশের নারীদের রূপ-সৌন্দর্যের খবরও রেখেছিলেন। এদেশের নবাব, বাদশাহ, রাজা, মহারাজদের হারেমে অপরূপ সব সুন্দরী বেগম ও বাঁদীদের দেখতে পেয়েছিলেন, তখন থেকেই তাদের চোখ লোভাতুর হয়ে উঠেছিল। তাদের লোভাতুর মনে শুধু রাজ্য নয়, তার সঙ্গে হারেমের সুন্দরী নারীদের হৃদয়াধিকারের আশাও মনে গেঁথে গিয়েছিল। তারপরের ঘটনা সম্বন্ধে ইতিহাসই সাক্ষ্য দেয় যে, একের পর এক নবাব, বাদশাহ, রাজা, মহারাজা সিংহাসনচ্যুত হয়ে গঙ্গা-যমুনা-ভাগীরথীর জলে মিশে গিয়েছিলেন আর ইংরোজরা তাদের হারেম থেকে বের করে এনেছিলেন তাদের বেগম ও বাঁদীদের। তাদের নিয়ে প্রমোদ-উদ্যানের শোভা বর্ধন করে বিলাসের পঙ্কে ডুবে গিয়েছিলেন ইংরেজরা। অতীতে তাদের কত যে বাগান বাড়ী ছিল ¯্রফে তাদের নারীদের নিয়ে বিলাসিতা করার জন্য। শুধু তখনকার সাধারন নারীরাই নন, খোদ ইংরেজ রমণীরাও তাদের লোভ লালসার হাত থেকে রেহাই পাননি বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। দীর্ঘ রাজত্বের পর ইংরেজরা এদেশ থেকে বিতাড়িত হলেও তাদের নৈতিকতা ধরে রেখেছেন বিবেক বিবর্জিত কিছু মানুষ। নারীর সম্ভ্রমের নূন্যতম মূল্য যেন তাদের অর্থের কাছে পরাস্থ।
তেমনই একটি ঘটনার পূন:জম্ম যেন নড়াইলের লোহাগড়ায়। ভূক্তভোগী ও তার পরিবার সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ইতনা গ্রামের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয়ের অধিন চাকুরীর অবসরপ্রাপ্ত পিতার ইচ্ছে ছিল একমাত্র মেয়েকে তিনি উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করবেন। মেয়ে সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ভাল কোন চাকুরী করে পিতা-মাতার মুখ উজ্জল করবেন। সেভাবে মেয়েকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পার করে দেশের সর্বচ্চ বিদ্যাপিঠ বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এন্ড টেকনোলজি (বি ইউ বি টি) তে ইংরেজিতে অনার্স (সম্মান) এ ভর্তি করিয়েছিলেন। ওই বিদ্যাপিঠে এখন সে, শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। সমগ্র পৃথিবী জুড়ে যখন মহামারী ‘করোনা’র প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, তখন অন্যান্য অভিভাবকদের ন্যায় তিনিও তার মেয়েকে বাড়িতে চলে আসতে বলেন। বাড়িতে থাকার সুবাদে গত মে মাসে ওই শিক্ষার্থী তার মা ও বড় ভাবীর সাথে থ্রি-পিচ কেনার জন্য লোহাগড়া বাজারের সরদার ক্লথ ষ্টোরে যান। সেখান থেকে তিনটি থ্রি-পিচও কিনেন। থ্রি-পিচ তিনটির মধ্যে কোন প্রকার কাঁটা,ছেড়া ও রং চটে গেলে পরিবর্তন করে দেওয়ার কথা বলে কৌশলে ওই শিক্ষার্থীর মোবাইল নম্বর নেন ওই দোকানের মালিকের আসনে বসা মো: রায়হান। প্রতারনার শুরুটা সেখান থেকে। পরে ওই দোকানী রায়হান বিভিন্ন দিন তারিখ ও সময়ে কারনে অ-কারনে ফোন করতেন ওই শিক্ষার্থীকে। দিতেন তাকে বিয়ে করে ঘরবাধাঁসহ বিভিন্ন প্রকার প্রলোভন। স্বপ্ন দেখাতেন উচ্চবিলাসী জীবনের। একসময় রায়হানের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েন ওই শিক্ষার্থী। পরে রায়হান তার নিজের বাইকে চড়িয়ে ওই মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন বিভিন্ন দর্শণীয় ও আকর্ষনীয় স্থানসহ রায়হানের নিকট আত্মীয় ও বন্ধুদের নির্জন বাড়ি এবং বাসাতে। পরে লোহাগড়ার মদিনা পাড়ায় অবস্থিত রায়হানদের আলিশান বাড়িতে এনে একাধিকবার একান্তে সময় কাটিয়েছেন। সেই সময়ে রায়হানের বড়ভাবী বাড়িতেই ছিলেন। ভাবী দিয়েছেন দুপুরের খাবারও। রায়হানের বড়ভাইয়ের সন্তানের জম্মদিনে দাওয়াতও পেয়েছেন। বিয়ের আগে অবাধ চলাচল ও বিচরন ছিল লক্ষণীয়। রায়হানের পিতা মো: আমির হোসেন, পেশায় একজন ব্যবসায়ী। তিনি গত কয়েক বছর আগে কোটি টাকার বিনিময়ে লোহাগড়ার পোদ্দার পাড়ার নিশিকান্ত রায়ের ছেলে রতন রায় গংদের কাছ থেকে লোহাগড়া বাজারের একটি দোকানঘরসহ জমি ক্রয় করেন। ক্রয়কৃত জমিতে সরদার ক্লথ ষ্টোর নামে একটি কাপড়ের দোকান প্রতিষ্ঠা করেন। যেটা লোহাগড়া বাজারের সর্ববৃহত কাপড়ের দোকান বলে বহুল প্রচলিত। দোকানে তিনিসহ তার দুই ছেলে পালাক্রমে ক্যাশসহ যাবতীয় কার্য পরিচালনা করে থাকেন। আমির হোসেনের মালিকানাধীন লোহাগড়ার মদিনাপাড়া, নড়াইল শহর ও গ্রামের বাড়ি মশাঘুনীতে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন বাড়ি। গ্রামের বাড়িটি বাগান বাড়ি নামে পরিচিত রয়েছে। কালনা-যশোর-খুলনা রুটে রয়েছে তিন থেকে চারটি হামদান পরিবহন বাসসহ দশ চাকার একাধিক ড্রাম ট্রাক। একটি বাস সড়কে চলাচল করলেও অপর গুলির বডি নির্মাণের কাজ করছেন ঢাকাতে। আমির হোসেনের বড় ছেলে এক সন্তানের জনক হলেও রায়হান ছিল অবিবাহিত। সেই সুবাদে দোকানে কোন সুন্দরী নারী ক্রেতা ও প্রবাসীর স্ত্রী এলেই কৌশলে তাদের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করতেন। পরে শুরু হতো তাদের মধ্যে মোবাইল ফোনসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার, হোয়ার্টসঅ্যাপ, ইমোসহ বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়ায় কথপোকথন। রায়হানের লালসার শিকার উপজেলার লক্ষীপাশা ও মরিচপাশা গ্রামসহ একাধিক গ্রামের কলেজ এবং স্কুল পড়ূয়া শিক্ষার্থী। এসব ঘটনায় ভূক্তভোগী পরিবার তাদের সম্মান ও সন্তানের ভবিয্যতের কথা ভেবে গোপনে একাধিকবার শালিস বৈঠকের মাধ্যমে রফা করেছেন বলে জানান লোহাগড়া বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী। পিতা আমির হোসেনের অঢেল সম্পদ থাকায় বিলাসী জীবনে মত্ত্ব রায়হান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মদিনাপাড়ার কয়েকজন বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে এই প্রতিবেদককে জানান, রায়হানের বিলাসী জীবন যেন সেকেলের রাজা-বাদশা ও ইংরেজদের বিলাসী জীবনকেও হার মানায়। রায়হানের হাতে অনেক নারীর সম্ভ্রম হারালেও টাকার বিনিময়ে সমঝোতা করে পার পেয়ে যেত রায়হার। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নী তার। গত ২৩ নভেম্বর রাতে ইতনা গ্রামের ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া মেয়ে খানম (ছদ্মনাম) এর বাড়ির অদুরে ফসলী মাঠে বাইক রেখে ডুকে পড়েন তার রুমে। রায়হানের ব্যবহৃত বাইকটি পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়দের সন্দেহ হলে ওই বাড়িতে খোজ-খবর নিয়ে স্থানীয়রা রায়হানকে মেয়ে খানমের রুমে অবরুদ্ধ করেন। এ সময় কনের পিতা-মাতা বাড়িতে না থাকায় স্থানীয়রা গ্রামবাসিকে খরব দেয়। খবর পেয়ে বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসি ওই বাড়িতে প্রবেশ করে ইসলামী শরিয়াহ্ মোতাবেক মাওলানা ও নিকাহ্ রেজিস্টার হাফেজ মাওলানা মো: রুহুল্লাহর মাধ্যমে ৫লাখ টাকা দেন মোহর ধার্য্য করিয়া বিনা উসুলে বিয়ে পড়ান। স্থানীয়দের কাছে যার ভিডিও ক্লিপ সংরক্ষিত রয়েছে। জানা যায় ওই বিয়ের নিকাহ্ রেজিস্টার ছিলেন ইতনা গ্রামের হাফেজ মাওলানা মো: রুহুল্লাহ। রুহুল্লাহ এক সময় রায়হানদের বাড়িতে তিন বছরের অধিক সময় জায়গীর থেকেছেন। সেই সুবাদে রায়হান তার পূর্ব পরিচিত। কনে পক্ষ রায়হানের পরিবারকে খবর দিতে চাইলেও বাদ সাধেন রায়হান ও নিকাহ্ রেজিস্টার। বিয়ের বিষয়টি গোপন রাখার জন্য রায়হান ও নিকাহ্ রেজিস্টার কনে পক্ষকে অনুরোধ করে বলেন তিনি প্রাপ্ত বয়স্ক, নিজের জীবনের যে কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সংরক্ষণ করেন। এই মুহুর্তে পিতা-মাতাকে জানালে হিতে বিপরীত হবার আশংকা করে বিষয়টি গোপন রাখার জন্য কনের পরিবারসহ স্থানীয়দের অনুরোধ করেন। কিন্তু বিধিবাম, পরের দিন বিষয়টি আর গোপন রাখতে পারেন নাই ইতনাবাসি। বিষয়টি রায়হানের পিতার গোচরীভূত হলে ২৬ নভেম্বর রায়হানের পিতা রায়হানকে অজ্ঞাত স্থানে পাঠিয়ে কনের সাথে সকল প্রকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখেন। এরপর রায়হানের পিতা নিকাহ্ রেজিস্টারসহ তলব করেন নিকাহ্ রেজিস্টারকে। আমির হোসেন, নিকাহ্ রেজিস্টার ও জাপান সাবুসহ কয়েকজন নিকটআত্মীয় গত ৯ ডিসেম্বর বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে সাড়ে ৬টা পর্যন্ত সরদার ক্লথ স্টোরে গোপন পরামর্শ করে নিকাহ্নামায় উল্লেখিত ৫ লাখ টাকা দেন মোহর ঠিক রেখে ৪ লাখ টাকা উসুল দেখিয়ে নিকাহ্ রেজিস্টারের শুন্যস্থান পূরণ করে একটি ভূয়া তালাকনামা প্রস্তুত করেন। যার সিসি ফুটেজ দেখলে সব পাওয়া যাবে বলে জানান নিকাহ্ রেজিস্টার হাফেজ মাওলানা মো: রুহুল্লাহ। নিকাহ্ রেজিস্টার আরও জানান, তিনি প্রাণের ভয়ে এমন অন্যায় কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন ‘আমাকে বাঁচান’। এ দিকে কনের অভিভাবকরা তালাকের বিষয়টি লোক মারফত জানতে পেরে কনের মাতা গত ১৪ ডিসেম্বর কাবিননামা চাহিয়া নিকাহ্ রেজিস্টার বরাবর একটি আবেদন করেন। নিকাহ্ রেজিস্টার উক্ত আবেদনে সাড়া না দিয়ে বিভিন্ন ভাবে তালবাহানা করে সময় ক্ষেপন করতে থাকে।
কাবিননামা পাইবার জন্য কনের পিতা লোহাগড়া থানার অফিসার ইনচার্জ ও কনে নড়াইলের জেলা প্রশাসক বরাবর পৃথক দুটি আবেদন করেন। আবেদনের প্রেক্ষিতে লোহাগড়া থানার ওসি মো: নাসির উদ্দিনের হস্তক্ষেপে গত ১৮ডিসেম্বর কাবিননামা প্রাপ্ত হন কনে পক্ষ। কনে কাবিননামা হাতে পেয়ে নিখোঁজ স্বামী রায়হানের সন্ধানে রায়হানের বাড়ি ও আশপাশে খোজ-খবর নেন। এক পর্যায়ে রায়হানের কোন সন্ধান না পেয়ে রায়হানের মদিনাপাড়ার বাড়িতে যান। সেখানে গেলে রায়হানের পরিবার তার সাথে অসাদাচরন ও অশ্লিলভাষায় গালমন্দ করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন। এরপর তিনি নিখোঁজ স্বামীর সন্ধানে গত ২০ ডিসেম্বর লোহাগড়া থানায় একটি সাধারন ডায়েরী করেন। পরদিন দু’জন স্বজনকে সঙ্গে নিয়ে স্বামী রায়হানের সন্ধানে কনে মদিনাপাড়ার বাড়িতে যান। এসময় বাড়িতে রায়হানের বড় ভাবী উপস্থিত ছিলেন। কনেকে দেখে রায়হানের ভাবি তার স্বামীকে বিষয়টি মোবাইল ফোনে অবহিত করলে বাড়িতে ছুটে আসেন রায়হানের বড়ভাই। রায়হানের ভাই বাড়িতে এসে কনের সাথে অসাদাচরন ও গালমন্দ করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করলে কনে স্থানীয় গণমাধ্যমসহ আশপাশের লোকজনদের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অবহিত করেন। খবর পেয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মী ও স্থানীয় লোকজন ওই বাড়িতে ছুটে যান। পরে অনেক নাটকীয়তার মধ্যে লোহাগড়া উপজেলার নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বিষয়টি হস্তক্ষেপ করেন। ইউএনও লোহাগড়া উপজেলার মহিলা বিষয়ক কর্মকতা মোছা: শিরিনা খাতুন ও উপজেলা পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ফারহানা ইয়াসমিনকে ঘটনাস্থলে প্রেরন করেন। উভয়ে কনের সব কিছু যাচাই-বাছাই করে কনের যোক্তিক দাবীর সঠিকতা পেয়ে ফিরে আসেন। রায়হানের সাথে ওই কনের বিয়ের বিষয়টি স্বীকার করে তার বড়ভাই মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কাছে মৌখিকভাবে জবানবন্ধি প্রদান করেন। বিষয়টি বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে ভাইরাল ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরে ঘটনার সুষ্ঠু সমাধানকল্পে উপজেলা নির্বাহী অফিসার কনেকে আশ্বস্থ করে তার মায়ের হেফাজতে দেন।
লোহাগড়া উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মোছা: শিরিনা খাতুন বলেন, কনে ও ছেলে উভয়ই প্রাপ্ত বয়স্ক এবং কাবিননামা সঠিক বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। তালাক দিয়েছে বলে ছেলে পক্ষ দাবী করলেও যাচাই করে দেখা যায় তালাকটি সঠিক নয় । নিকাহ্ রেজিস্ট্রির তারিখ থেকে ৯০ দিন পর তালাক প্রদান করলে তালাকটি সঠিক বলে গন্য করা হয়। এ ক্ষেত্রে তার ব্যত্যয় ঘটেছে।
লোহাগড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: আজগর আলী জানান, বিষয়টি নিয়ে ২৮ ডিসেম্বর উপজেলা পরিষদ হলরুমে উভয় পরিবারের সাথে আলাপ আলোচনা ও কাগজপত্র পর্যালোচনা করে ঘটনার সুষ্ঠু সমাধান করা হবে।
নারীর সম্ভ্রমের মূল্য যখন এক লাখ!
নারীর সম্ভ্রমের মূল্য যখন এক লাখ!
Be the first to comment on "নারীর সম্ভ্রমের মূল্য যখন এক লাখ!"