নিউজ ডেস্ক: বসন্ত বিদায় নিয়েছে তার সব রূপ-রঙ নিয়ে। বঙ্গাব্দ ১৪২২-এর সূর্যাস্তের মধ্য দিয়েই বাংলার বুক থেকে বিদায় নিল আরো একটি বাংলা বছর। বাঙালির জীবনে এসেছে নতুন ভোর, নতুন সূর্য। আজ বৃহস্পতিবার, পহেলা বৈশাখ, ১৪২৩ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন। আজ থেকে আরেকটি নতুন বছরের পরিক্রমা শুরু হলো বাঙালির বর্ষপঞ্জিতে। বাঙালির সবচেয়ে বড় সর্বজনীন উত্সবে মেতে ওঠার দিন। দিনভর সারাটা দেশ মেতে রইবে নাচে-গানে, উত্সবে-আনন্দে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই রঙের উত্সবে মিলেমিশে হয়ে যাবে একাকার। ‘তাপস নিঃশ্বাস বায়ে/মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে’ বলে যে নবীনের আহ্বান চলছে যুগ যুগ ধরে নতুন বছরে নতুন প্রত্যাশায়, সেই স্বপ্ন দেখার দিনও আজ।
এদিন যে কোনো অশুভ শক্তিকে মোকাবিলা করতে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে গোটা রাজধানীজুড়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিশেষ করে সোহওয়ার্দী উদ্যান, রমনাপার্ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ আশপাশ এলাকা মুড়িয়ে দেয়া হয়েছে নিরাপত্তার চাদরে। ভোরে শাহবাগে চারুকলার ঐতিহ্যবাহী মঙ্গলশোভাযাত্রা ঘিরে রাখবে যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সোয়াট ও এলিট ফোর্স র্যাবের চৌকস সদস্যরা। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজধানীর আকাশপথে প্রস্তুত থাকছে র্যাবের হেলিকপ্টার। একই সঙ্গে বাংলা নববর্ষ বরণের উত্সবকে নির্বিঘ্ন করতে আজকের দিনে সারাদেশে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এদিকে দেশবাসীকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রধানরা। নববর্ষ উপলক্ষে আজ বৃহস্পতিবার সরকারি ছুটির দিন। সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন ও রেডিও চ্যানেলগুলো প্রচার করছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে সংবাদপত্রগুলো প্রকাশ করেছে বিশেষ সংখ্যা।
ইদানীং নাগরিক জীবনে যে সাংস্কৃতিক চেতনায় পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হচ্ছে, তা প্রবর্তনের কৃতিত্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। শান্তিনিকেতনে ঋতুভিত্তিক উত্সবের আয়োজন করেছিলেন তিনিই। এরই অংশ হিসেবে বৈশাখবরণ উত্সবের জন্য বাংলা নতুন বছরকে সম্ভাষণ জানিয়ে রচনা করেছেন বহু কালজয়ী গান ও কবিতা। বাঙালির কণ্ঠে আজ ছড়িয়ে যাবে সেই চেনা সুর ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো…।’
কিন্তু হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী অসাম্প্রদায়িক বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র নতুন নয়, বারবার এসেছে ছোবল। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখে রমনায় বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে মৌলবাদীরা বোমা মেরে নিরীহ মানুষ হত্যা করে। গত বছরের বাংলা বর্ষবরণে উত্সবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় নারীদের লাঞ্ছনার চেষ্টা চালায় অশুভ শক্তি। কিন্তু থামাতে কি পেরেছে প্রাণের উত্সবে মানুষের ঢল? এখন আরো বড় হয়েছে সে আয়োজন। বিস্তৃত হতে হতে উত্সব যেন গণজোয়ার আজ। বরাবরের মতো আজও সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রমনায় রয়েছে ছায়ানটের বর্ষবরণ উত্সবের আয়োজন। সেতারে আলাপ-জোড়ের মধ্য দিয়ে শুরু হবে এবারের আনুষ্ঠানিকতা। অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করবে বিটিভি ও বিটিভি ওয়ার্ল্ড। চারুকলার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রতীকী মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করবেন সর্বস্তরের মানুষ।
বর্ষবরণের অনুষ্ঠানমালা: বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, গণগ্রন্থাগার অধিদফতর, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটগুলো ও বিসিক নানা অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করবে। এ উপলক্ষে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলার আয়োজন করেছে।
রমনা বটমূলে সকাল সোয়া ৬টায় মনকে শুদ্ধ করে এমন গান (সুরলহরী) দিয়ে শুরু হবে ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ উত্সব। এরপর শুরু হবে ছায়ানটের শিল্পীদের সমবেত সঙ্গীত পরিবেশন এবং দেশের জনপ্রিয় শিল্পীদের একক পরিবেশনা। দেশপ্রেমের গান, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও পাঁচ কবির গান পরিবেশন করা হবে রমনার বটমূলে। এ ছাড়া প্রতিবারের মতো এবারো মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে। এ মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের মানুষ। বাংলা একাডেমি সকাল সাড়ে ৭টায় বর্ষবরণ সংগীতের মধ্য দিয়ে তাদের নববর্ষের অনুষ্ঠান শুরু করবে। নজরুল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে একক বক্তৃতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
এ ছাড়া বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে উত্সব উপলক্ষে জেলা-উপজেলা থেকে শুরু করে গ্রামবাংলার হাটবাজারেও আজ হবে হালখাতা উত্সব। দেশের বিভিন্ন স্থানে বৈশাখী মেলাসহ নানা উত্সব অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। প্রতি বছরের মতো এবারো সরকারি উদ্যোগে বিভাগীয় শহর, জেলা-উপজেলায় আয়োজন করা হয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা ও গ্রামীণ লোকজ মেলা। কারাগার, হাসপাতাল ও শিশু পরিবার (এতিমখানায়) উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে আজ।
এদিকে বাংলা শুভ নববর্ষ ১৪২৩ পালন উপলক্ষে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার আয়োজন করেছে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ। আজ সকাল ৭টায় ঐতিহাসিক বাহাদুর শাহপার্ক থেকে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ পর্যন্ত বর্ষবরণ বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত থাকছেন। এ ছাড়া নববর্ষ বরণ উপলক্ষে আওয়ামী লীগের সব শাখা সংগঠন, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বৈশাখী মেলাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। অপরদিকে নববর্ষ উপলক্ষে সকাল ১০টায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের নেতারা ও উপদেষ্টা পরিষদ দলের সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন।
অন্যদিকে হোটেল সোনারগাঁও, র্যাডিসন, ওয়েস্টিন, ঢাকা রিজেন্সি, পূর্বাণী, খাজানাসহ হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলোর উদ্যোগে উদযাপিত হচ্ছে নতুন বছরের উত্সব। ঢাকা ক্লাব, গুলশান ক্লাব, অফিসার্স ক্লাব, উত্তরা ক্লাবের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হচ্ছে। দুপুর থেকে রাত অবধি কনসার্টের আয়োজন করেছে ফ্যান্টাসি কিংডম ও নন্দন পার্ক। ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবরে আলোকিত বৈশাখে কনসার্টের আয়োজন করেছে ব্লুজ। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়ও বর্ষবরণে নানা আয়োজন রয়েছে।
রাজধানীতে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা: পহেলা বৈশাখে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে রাজধানীজুড়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দুইদিন আগ থেকেই বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। পুলিশ, র্যাবের গোয়েন্দাসহ বিভিন্ন সংস্থার সাদা পোশাকধারী গোয়েন্দারা ইতিমধ্যেই অনুষ্ঠানস্থল ও আশপাশের এলাকায় তত্পরতা শুরু করেছে। রমনা বটমূল, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোকে আনা হয়েছে সিসি ক্যামেরার আওতায়। রমনা বটমূলে এই প্রথম থাকছে পুলিশের টু হুইলার। যার মাধ্যমে পুলিশ অনুষ্ঠানস্থল টহল দিচ্ছে। পাশাপাশি আজকের পহেলা বৈশাখে বিকাল ৫টার পর উন্মুক্ত স্থানে কোনো ধরনের কনসার্ট বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। সেই সঙ্গে নববর্ষের সকালে নির্বিঘ্নে মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজনে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, রাজধানীতে বর্ষবরণ আয়োজনের মূল কেন্দ্র সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সব ফটক বিকেল সাড়ে ৪টার পর বন্ধ করে দেয়া হলেও শহরের রাস্তায় বেড়াতে বা আনন্দ উদযাপনে কোনো বাধা নেই। ডিএমপি কমিশনার জানান, রমনা বটমূল, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও রবীন্দ্র সরোবরে নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়েছে। বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, সোয়াত টিম, ফুট পেট্রল টিম সক্রিয় রয়েছে।
অপরদিকে র্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেছেন, পয়লা বৈশাখে তাত্ক্ষণিক যে কোনো প্রয়োজনে স্ট্রাইকিং রিজার্ভ ফোর্স প্রস্তুত রয়েছে। আকাশপথে হেলিকপ্টারে করে সম্ভাব্য সব স্থানে নজরদারি অব্যাহত রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, পুরো রাজধানীর সম্ভাব্য সব স্থানের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। রাজধানীজুড়ে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। এ ছাড়া মোটরসাইকেলে র্যাব সদস্যদের টহল থাকবে। সাদা পোশাকে র্যাবের গোয়েন্দা সদস্যরা এবং ডগ স্কোয়াড দায়িত্ব পালন করছে। র্যাব মহাপরিচালক বলেন, বর্ষবরণ উত্সবে রমনাপার্ক ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দর্শনার্থীদের সমাগম বেশি থাকে। তাই ওই দুই এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি এলিট ফোর্স র্যাব রাজধানীসহ সারাদেশের নিরাপত্তায় বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
আঁকিবুকি শিশু চিত্র ও টেরাকোটা প্রদর্শনী: পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে মারজান জাহান মৌমিতা, অথৈই পাল, জয়নুল হোসেইন, নুজহাত তাসসিম, তানজিনা তাজরিন। ছোট ছোট শিশুদের কেউ হাতে তুলে নিয়েছে রং তুলি কেউবা কাদা। কাদায় ইচ্ছেমত আকার দিয়ে তৈরি করেছে টেরাকোটা। নিজের মনের রং দিয়ে কাগজের ওপর রং তুলির আঁচড়ে নানা দৃশ্য। গতকাল বুধবার রাজধানীর বাসাবো বালুর মাঠের পাশে আঁকিবুকি আর্ট গ্যালারিতে ছোট্ট সোনামনিদের এই টেরাকোটা ও ছবির প্রদর্শনী শেষ হলো। আঁকিবুকি আর্ট একাডেমি এই প্রদর্শনীর আয়োজন করে। এতে ২২ শিশুর আঁকা ছবি, টেরাকোটা, নানা রং ও ঢং এর মুখোশ প্রদর্শন করা হয়। ১ এপ্রিল এই প্রদর্শনীর শুরু হয়েছিল। প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক আবুল বারাক আলভী ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক অধ্যাপক হায়াত্ মাহমুদ। আঁকিবুকি আর্ট একাডেমির পরিচালক ফারজানা শিরীন বলেন, ছোটদের মেধা বিকাশে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চেষ্টা করব প্রতি বছর এমন উদ্যোগ। এতে বাচ্চারা আরো উত্সাহিত হবে।
সূত্র: মানবকণ্ঠ

Be the first to comment on "পহেলা বৈশাখ: রঙের উৎসবে একাকার হওয়ার দিন আজ"