শিরোনাম

মুস্তাফিজের অপারেশন ও ক্যারিয়ার নিয়ে যা বললেন মাশরাফি

নিউজ ডেস্ক: এক স্বাক্ষাতকারে বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি মুর্তজা কথা বললেন মু্স্তাফিজের অস্ত্রোপচার, এটার শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো নিয়ে। সতর্ক করলেন ভবিষ্যতের জন্য, বাংলাদেশের ক্রিকেটের কিভাবে সামলানো উচিত মুস্তাফিজকে। বিশ্বাস দিলেন, আগের চেয়েও ধারালো হয়ে ফিরবেন মুস্তাফিজ। বাংলাদেশের ক্রিকেট একটা কথা খুব প্রচলিত, সবচেয়ে বড় ইনজুরি বিশেষজ্ঞ নাকি মাশরাফি বিন মুর্তজা। সাতটি অস্ত্রোপচার ও ক্যারিয়ার জুড়ে ছোট-বড় এত চোট সামলেছেন যে, এসবের খুঁটিনাটি তার নখদর্পনে।
নিজের প্রথম অপারেশন নিয়ে মাশরাফি মুর্তজা বলেন, প্রথমবার তো আমার অপারেশন হলো ভারতেের বেঙ্গালোরে। একটু ভুল অপারেশন হয়েছিল। তবে আমাকে তারা আতিথেয়তা দিয়েছিল দারুণ। তাই সময়টা ভালোই কেটেছিল। ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ায় তো আরও প্রফেশনাল কাজ হয়। মুস্তাফিজকে নিয়ে ভয় নেই।
মুস্তাফিজের অপারেশনও জটিল নয়। স্পোর্টস পারসনদের মাসলগুলো তো মাসল বিল্ড হওয়াই থাকে। পোস্ট অপারেটিভ বিপদ বা শঙ্কা তাই বেশি থাকে না। ব্যথা-ট্যাথা থাকে। সমস্যা হলো, এরপর ওকে ৫-৬ মাস কঠিন সময় পার করতে হবে তাকে। ধৈর্য্য ধরতে হবে।
মাশরাফি বলেন, প্রথমবার সবসময়ই নার্ভাসনেস কাজ করে। যতোই আপনাকে লোকে বোঝাক বা অভয় দিক, অপারেশন থিয়েটার মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার। ওখানে যাওয়ার আগে একটু ভয়-অস্বস্তি লাগবেই স্বাভাবিকভাবে। তবে ওখানকার ডাক্তার-ফিজিশিয়ান যারা আছেন, তাদের ওপর নির্ভর করে যে কতটা স্বাভাবিক থাকা যায়।
এমনিতে আমার সঙ্গে ওর কথা হয়েছে নিয়মিত। অপারেশন নিয়ে কথা কম হয়েছে, অন্য সব কথাই বেশি হয়েছে। মজা-টজা করেছি। আমার মনে হয় না ওর খুব বেশি সমস্যা হবে। অন্য আট-দশজন ক্রিকেটার হলে হয়ত আমি চিন্ত করতাম। কিন্তু মুস্তাফিজ বলে কথা, ওকে নিয়ে ভয় নেই। আমরা আছি, বোর্ড আছে, মিডিয়া ও জনসাধারণ, সবাই ওর পাশে। এটা বিশাল একটা সাপোর্ট।
মাশরাফি আরও বলেন, কাঁধের ইনজুরি কখনও হয়নি তার। রুবেলের এই অপারেশনই হয়েছে, তামিম-নাসিরদের ছিল এই ইনজুরি। যতটুকু জানি, ব্যাপারটা সিরিয়াস না। হাঁটু, পিঠ, বা এসব অপারেশনের মত বড় কিছু না। কিন্তু পুরো প্রক্রিয়াটা ক্রিটিক্যাল। যে জায়গাগুলো অপারেশন করে ঠিক করবে, দীর্ঘ রিহ্যাব করে সেসবের স্ট্রেংথ আবার বের করা। এরপর সুনির্দিষ্ট এক্সারসাইজগুলো করা। সব মিলিয়ে ক্রিটিক্যাল, এজন্যই ৬ মাসের মত সময় লাগবে।
কাঁধের অপারেশন বলে কাঁটাছেড়া বেশি নেই। অন্য জায়গায় হলে যেমন পিঠ হলে অনেকটুকু কেটে ফেলে বা হাঁটুতে হলে বাটি পুরো খুলে ফেলে, কাঁধের অপারেশনে সেরকম কিছু নেই।
নিজের হাঁটুর অপারশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার যখন দুই হাঁটুতে অপারেশন হলো, তখন প্রায় সাড়ে চার ঘন্টা ধরে হয়েছিল অপারেশন। ৬ ঘন্টা ছিলাম সংজ্ঞাহীন। পুরো হাঁটু খুলে ফেলেছিল। আগের অপারেশনে যে ভুল হয়েছিল, অন্য একটা হাড় ভুল করে কেটে ফেলেছিল, সেটা নিয়ে তারা অবাক হয়েছে, আলোচনা করেছে আমাকে অপারেশন টেবিলে রেখেই। টানা চারদিন প্রচণ্ড স্ট্রাগল করেছি।
মুস্তাফিজের ক্ষেত্রে এরকম হবে না। ব্যথা তো কিছু থাকবেই। তবে হাঁটুর মতো তীব্র না হয়ত। তবে আর্থোস্কপি করা যায়। কিন্তু আমার সমস্যাটা ছিল লিগামেন্টে, সেখানে আর্থাস্কোপি করা যায় না। কাঁধের ক্ষেত্রে আর্থাস্কোপি, দুটি ছিদ্র করে কাজ করে ফেলা যায়।
ক্যারিয়ারের শুরুতেই মুস্তাফিজের অস্ত্রোপচার তার ভবিষ্যতের পথচলায় কতটা প্রভাব ফেলতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে ম্যাশ বলেন, অনেকে নেতিবাচকভাবে দেখতে পারে। অপারেশন হচ্ছে, অবশ্যই এটা ভালো কিছু নয়। তবে ইনজুরি হয়ে গেলে তো কিছু করার নেই। এর মধ্যে ইতিবাচক দিকগুলো এখন ভাবতে হবে আমাদের।
যেমন, এখন সে জানল যে কিভাবে নিজেকে মেইনটেইন করতে হবে। আরও সাবধান হবে যে কতটুকু খেলতে হবে, কতটা অনুশীলন করতে হবে। উপলব্ধি করতে পারবে, বোলিংয়ের জন্য শরীরের কোন জায়গাগুলি সুনির্দিষ্ট করে গুরুত্বপূর্ণ। নইলে এরকম আবার হতে পারে। সবার জন্য এই ধাক্কা হতে পারে একটা শিক্ষা।
অনেকে ধারণা করছে যে মুস্তাফিজ হয়ত আগের মত ফিরবে পারবে না। এটা পুরো ভুল ধারণা। একটা ব্যাপার হলো, মুস্তাফিজ অর্ধেক ফিরে এলেও ওকে সামলানো কঠিন। আমি আগেও বলেছি, মুস্তাফিজ সকালে ঘুম থেকে উঠে বা হেঁটে হেঁটে গিয়ে বল করলেও ওকে খেলা কঠিন। তবে অর্ধেক নয়, রিহ্যাব ভালোভাবে করতে পারলে আগের মুস্তাফিজ থেকে আরও ভালোভাবে ফিরবে।
কারণ, ৬ মাস সময়ে পুরো শরীরটাকে গড়ে তুলতে পারবে সে। রিহ্যাবে শুধু যে কাঁধ নিয়ে কাজ হবে, তা নয়। হাঁটু, অ্যাঙ্কেল, পিঠ, কাঁধ…যে চার-পাঁচ জায়গা পেস বোলিংয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সবকটা জায়গা আরও শক্তিশালী করে ফিরবে।
এই ৬ মাসে আমাদের খুব বেশি খেলা নেই। তাই খুব নেতিবাচক দেখছি না। বরং শুরু থেকে যতটা ক্রিকেট খেলছে, এই ধাক্কাটা স্বাভাবিকই ছিল। আমার কাছে মনে হয়, একদিক থেকে এটা ভালো যে ৬ মাস পর সে আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরবে।
মাশরাফি বলেন, আমি কিন্তু শুরু থেকেই বলছি, মুস্তাফিজকে ঠিক করতে হবে কোনটা খেলবে, কোনটা নয়। বেশি খেলে ফেলেছে মানে কিন্তু কাউকে দোষ দিচ্ছি না। ব্যপারটা হলো, ওর মতো একটা সম্পদ পাওয়া খুব বিরল। ওর ভেতর এই সামর্থ্য আছে যে আমাদের সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্ট জেতাতে পারে। ক্রিকেট জাতি হিসেবে আমরা ভাগ্যবান যে ওর মতো একজন পেয়েছি।
প্রথম কথা হলো, আমি চাইব সব কিছুর আগে ও বাংলাদেশের হয়ে খেলুক। বাংলাদেশের হয়ে যেন একটা ম্যাচও মিস না করে। তার পর অন্য কোনটা খেলবে না খেলবে, সেটা ঠিক করুক। আর্থিক ব্যাপার যেহেতু আছে, আইপিএল খেলবে। তারপর অন্যগুলোর মধ্যে বাছতে হবে।
ওয়াসিম আকরাম কাউন্টিতে দারুণ করেছে, কিন্তু সে গ্রেট হয়েছে পাকিস্তানের হয়ে খেলে। ওয়াকার বা ম্যাকগ্রা বা ম্যালকম মার্শাল, সবাই দেশের হয়ে খেলেই গ্রেট। মুস্তাফিজকেও গ্রেট হতে হলে বাংলাদেশের হয়ে খেলেই হতে হবে। আমি সেটাই চাই। ওয়াসিম দেশকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছে, ম্যাকগ্রা জিতিয়েছে, ব্রেট লি জিতিয়েছে, মুস্তাফিজও দেশকে বিশ্বকাপ এনে দিক। ওর ভেতরে গ্রেটনেসের উপাদান আছে। আমাদের দল এখন অনেক ভালো, অনেক ভালো ক্রিকেটার আছে। সঙ্গে মুস্তাফিজ থাকলে সবই সম্ভব। বলেন টাইগার অধিনায়ক।
তার আইপিএল আপনি আটকাতে পারবেন না। একটা কথা বলে রাখি, দেশের হয়ে খেলায় সবকিছুর আগে কাজ করে প্যাশন। আপনি বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জিজ্ঞেস করুন যে টাকা না দিলে খেলবে কিনা, সবাই খেলবে। কিন্তু তার পরও একটা ক্রিকেটারের পরিবার আছে, আর্থিক নিরাপত্তার ব্যাপার আছে। আরও অনেক বাস্তবতা আছে। আইপিএল থেকে থামানো কঠিন।
কিন্তু এরপর বিগ ব্যাশ, বা ইংল্যান্ড-দক্ষিণ আফ্রিকার টুর্নামেন্ট, সিপিএল, পিএসএল, বিপিএল -এসব থেকে কোনটা খেলবে, কোনটা আর্থিকভাবে ভালো হবে, কোনটায় শরীর ঠিক থাকবে, দেশের হয়ে খেলায় সমস্যা থাকবে না; এসব ভাবতে হবে তাকে।
আসন্ন ইংল্যান্ড সিরিজে তাকে না পাওয়া বিষয়ে মাশরাফি বলেন, ওকে অনেক মিস করব। ওর মতো বোলারকে একটা সিরিজও না পাওয়া মানে… ম্যাচের কিছু মুহূর্ত আসে যখন শোয়েব আখতার, ব্রেট লি এলেও আমার লাভ নাই। আমার লাগবে মুস্তাফিজকে। ওকে নিয়ে আমি এতটাই নিশ্চিত থাকি। মিস তো করবই।
তবে বাকি যারা আছে, সবাই ভালো। রুবেল ফিরছে, তাসকিন ক্লিয়ার হয়ে ফিরবে আশা করি। আল আমিন আছে। ব্যাক আপ আছে। ওদের প্রতিও আস্থা আছে।

basic-bank

Be the first to comment on "মুস্তাফিজের অপারেশন ও ক্যারিয়ার নিয়ে যা বললেন মাশরাফি"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*