ড. মো. হুমায়ুন কবীর: সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধর্মকে কটাক্ষ করে কেউ যাতে কোন কথা বলা কিংবা লেখালেখি না করেন, সে বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। মানুষের এ ধর্মীয় অনুভুতির দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে কিছু কিছু স্বার্থান্বেষী ধর্মব্যবহারকারী হিসেবে পরিচিত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা সংগঠন। ধর্মকে যুগেযুগে স্বার্থের কাজে অপব্যবহারের নজির রয়েছে ভুরিভুরি। সেখানে রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থ আয়ের উৎস হিসেবেও ধর্মকে ব্যবহার করতে কুন্ঠাবোধ করেনা অনেকে। ধর্মের নামে সেইসব ভণ্ডামি, বকধার্মিকতা, প্রতারণা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুপ-মুণ্ডুকতা অনেক সময় দেশে, সমাজে, মানুষে-মানুষে নানা বিপর্যয় নিয়ে আসে। আজ বিশ্বের দেশে দেশে যে ধর্মীয় জঙ্গিবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে সেখানেও বেশীরভাগ মুসলমানের সহজ-সরল ধর্মভীরুতা এর অন্যতম একটি কারণ।এখন ধর্মচর্চা শুধু মাদ্রাসা পড়ুয়া মুষ্টিমেয় কিছু লোকের কাজ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
রমজান মাসে কোরআন শিক্ষার ফজিলতই আলাদা, কারণ এ মাসেই যে মহান আল্লাহ পাক মহাপবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল-কোরআন নাজিল করেছিলেন। আমরা সবাই একবাক্যে স্বীকার করব, বাংলাদেশের মুসলমানরা মূলত ধর্মান্ধ নয়, তবে তারা ধর্মীয় আচারাদি প্রতিপালনে ধর্মভীরু বটে। আর এ ধর্মভীরুতার কারণেই দেশের বেশির ভাগ মুসলমান ধর্মের অনুশাসনগুলো যথাসাধ্য সুষ্ঠু ও শুদ্ধভাবে মেনে চলার চেষ্টা করে থাকে। এমন অনেক মুসলমান আছেন, যাঁরা হয়তো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন না, কিন্তু ধর্মের বিষয়ে খুই সংবেদনশীল। আবার কেউ কেউ শুধু শুক্রবারে জুমার নামাজ আদায় করে থাকেন। আবার এমন মুসলমানও আছেন, যারা শুক্রবারের নামাজ পড়েন না, কিন্তু রমজান মাসের জুমা ও দুই ঈদের নামাজ ঈদগাহ মাঠে গিয়ে পড়ে থাকেন। তার পরও দেখা গেছে, সব মুসলমানই তাঁদের ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টি খুবই সংবেদনশীলতার সঙ্গে রক্ষা করে থাকেন।
বাংলা, ইংরেজি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীসহ সব মানুষের মধ্যে প্রয়োজন ব্যাপকভাবে ধর্মচর্চা। আর ধর্মচর্চার জন্য সব মুসলমানকেই সচেতন হতে হবে। সে জন্য স্বাভাবিকভাবে অন্তত প্রয়োজন একটু পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল-কোরআন বিষয়ে লিটারেসি অর্জন করা। আমাদের ছোটবেলায় গ্রামে-গঞ্জে স্বাভাবিক বয়সে স্কুলে যাওয়া শুরুর আগেই নিজের বাড়িতে মা-চাচিদের কাছে কিংবা কখনো পাড়ার মক্তবে হুজুরের কাছে আরবি পড়া একপ্রকার বাধ্যতামূলকভাবেই শিখতে হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, প্রথমে অক্ষর ও আরবি ভাষা শেখার জন্য ‘কায়দা’ পড়ানো হয়। কায়দা পড়া শেষ হলে পবিত্র কোরআনের ভাষা ও সুরা পড়া আয়ত্ত করার জন্য অত্যন্ত আনন্দচিত্তে ‘সিপারা’তে ছবক নেওয়া হয়। আবার সিপারা পড়া শেষ হলে পরম করুণাময় আল্লাহ পাকের নাজিল করা মুসলমানদের জন্য মহাপবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল-কোরআনে ছবক নিয়ে, তা অতি গুরুত্বসহকারে সহি উচ্চারণে শেখানো হয়। কিন্তু এখন গ্রামাঞ্চলের ছোটকালের ছেলেমেয়েদের মধ্যে সে পদ্ধতিতে কোরআন শিক্ষার প্রয়াস কিছুটা অব্যাহত থাকলেও আধুনিক সভ্যতার শহরাঞ্চলে তা তেমন একটা দেখা যায় না। কারণ, তারা বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের লেখাপড়ার প্রতিযেগিতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। সেখানে সকালে ঘুম থেকে উঠে শুধু একমাত্র চিন্তা থাকে কেমন করে কোন স্কুলে ভর্তি করা যায়, কোন কোচিংয়ে অধিকতর পাঠ নেওয়া যায়, আবার তার সঙ্গে আছে গান, নাচ, আবৃত্তি ইত্যাদি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সংযুক্ত করা। কিন্তু এতে করে শিশু বয়সেই তাদের একটি অসম প্রতিযোগিতার ভেতর দিয়ে বড় হতে হচ্ছে। সেখানে নেই শুধু ধর্মীয় শিক্ষা। এ শিক্ষার বেলাতেই আর সময়ে কুলোচ্ছে না। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। হালে এসব বাচ্চাই বড় হলে তাদের ধর্মের ভয় দেখিয়ে নাম লেখাচ্ছে নানা ধরনের ধর্মীয় মৌলবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের মতো ঘটনায়। পাশাপাশি জড়িয়ে পড়ছে মাদকাসক্তিতে।
এরা যে শুধু তাদের পরিবারের জন্যই সমস্যা সৃষ্টি করছে, তা কিন্তু নয়। তারা সমস্যা সৃষ্টি করছে পুরো দেশ-জাতি, এমনকি কখনো কখনো গোটা বিশ্বের জন্যও। কিন্তু যদি তাদের প্রথাগতভাবে ধর্মীয় মূল্যবোধের ভেতর দ্বীনি-এলেম শিক্ষা দেওয়া যেত, তাহলে হয়তো এ রকমটা কখনো ঘটার সম্ভাবনা থাকত না। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, ছোটবেলায় পবিত্র কোরআনসহ অন্যান্য ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিতদের মধ্যে ধর্মান্ধতা অনেকটা কম; বরং তারা কিছুটা হলেও এগুলো সম্পর্কে ধারণা রাখে বিধায় তাদের সহজে ভুল পথে এসব কাজে লিপ্ত হতে দেখা যায় না। এখন শহরেও মসজিদে মসজিদে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের দ্বারা শুদ্ধ ও সহিভাবে পবিত্র কোরআন পড়ানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে। রোজার মাসে এর ব্যাপকতা অনেক বৃদ্ধি পায়। আর ঠিকমতো স্কুলের ধরাবাঁধা লেখাপড়া শুরু করার আগেই ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব। কারণ, ছোটকালে মুখস্থ বিদ্যায় আগ্রহ ও দখল একটু বেশি থাকে। কেননা, ছোটকালেই মহাগ্রন্থ আল-কোরআন মুখস্থ করার জন্য হাফেজি পড়ানো হয়ে থাকে। যেহেতু একটি নির্দিষ্ট বয়স হলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় ও রোজা করা মুসলিম সন্তানদের জন্য ফরজ, সে জন্য বাল্যকালেই শুদ্ধ ও সহিভাবে নামাজ শিক্ষারও প্রয়োজন রয়েছে। এগুলো পালন করতে থাকলে তখন মানুষ হিসেবে সবার মধ্যে ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত হতে থাকে এবং কেটে যেতে থাকে ধর্মান্ধতা, সে সঙ্গে ধর্মভীরুতাও। পাছে বৃদ্ধি পায় পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় চেতনাবোধ। তখন তাদের কেউ আর চেষ্টা করলেও বিপথে নিতে পারে না।
কাজেই আজ সময় এসেছে দেশের প্রত্যেক মুসলমান নাগরিকের সন্তানরা যাতে ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী দ্বীনি শিক্ষার অংশ হিসেবে মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল-কোরআন শুদ্ধ ও সহিভাবে শিখতে পারে। আর এ রমজান মাসই হোক এর শুভ সূচনা। তবেই আজকের যে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, গুণ্ডামি, ভণ্ডামিতে ধর্মকে যত্রতত্র ব্যবহার রোধ করা সম্ভব হবে। সেখানেই মহান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর প্রেরিত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশিত পথে পরিচালিত হতে সহজ হবে।
লেখক : ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
সূত্র: এনটিভি অনলাইন

Be the first to comment on "রমজানে কোরআন ও নামাজ শিক্ষা"