নিউজ ডেস্ক: ঢাকার মোহাম্মদপুরের কলেজ শিক্ষক কৃষ্ণা কাবেরী মণ্ডল হত্যা মামলায় গোয়েন্দা পুলিশ এক বছরে ১৫ বার সময় নিয়েও আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে না পারায় হতাশা প্রকাশ করেছেন নিহতের স্বজন ও সহকর্মীরা।
গত বছর ৩০ মার্চ মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের ভাড়া বাসায় হামলায় মারাত্মক আহত ও দগ্ধ হয়ে পরদিন হাসপাতালে মারা যান কৃষ্ণা (৩৫)।
কৃষ্ণা আদাবরে মিশন ইন্টারন্যাশনাল কলেজের সমাজকল্যাণ বিভাগের প্রভাষক ছিলেন। তার স্বামী সীতাংশু শেখর বিশ্বাস বিআরটিএর প্রকৌশল বিভাগের উপপরিচালক।
আলোচিত এ হত্যা মামলার প্রধান আসামি কে এম জহিরুল ইসলাম পলাশ নিহত কৃষ্ণার স্বামী সীতাংশুর শেয়ার ব্যবসার সহযোগী।
এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য পঞ্চদশ দিন ছিল গত বৃহস্পতিবার। সেদিন তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক (ডিবি) দেলোয়ার হোসেন সময় চাইলে আগামী ১৩ জুন প্রতিবেদন দাখিলের নতুন দিন রাখা হয়।
মামলার আরেক আসামি একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মচারী মারুফ হায়দারি সোহাগ গ্রেপ্তার হওয়ার পর ইতোমধ্যে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন। তার সঙ্গে প্রধান আসামির যোগাযোগ ছিল বলে পুলিশের দাবি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিহতের এক নারী সহকর্মী বলেন, “হত্যার আসল কারণ সম্পর্কে আমরা আজও অন্ধকারে। কৃষ্ণা খুব সৎ, কর্তব্যপরায়ণ শিক্ষক ছিলেন।
“আমরা তাকে খুব ভালোবাসতাম। তার স্বামীর সঙ্গে হত্যাকারীদের যদি কোনো গণ্ডগোল থাকে, তার দায় কৃষ্ণা ও তার সন্তানদের ওপর পড়বে কেন? ”
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা এ হত্যার কারণ জানতে চাই। দেখতে চাই দ্রুত তদন্ত ও বিচার। তদন্তেই যদি এত সময় যায়, তবে বিচার আর কী হবে?”
নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, গুলশানের একটি ব্রোকারেজ হাউজের কর্মকর্তা জহিরুল শেয়ার ব্যবসায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে হতাশায় ছিলেন। সীতাংশুর আট লাখ টাকার বিও হিসাব ওই ব্রোকারেজ হাউজে ছিল। তার শেয়ার আত্মসাৎ করতেই বাসায় ওই হামলা চালানো হয়।
মামলায় বলা হয়, ঘটনার দিন সন্ধ্যার পর সীতাংশু কুমার বিশ্বাসের জন্মদিনে কেক, মিষ্টি ও মোমবাতি নিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে ইকবাল রোডের ওই ভাড়া বাসায় আসেন জহিরুল। কেক কাটার পর কৌশলে সীতাংশুকে চেতনানাশক মেশানো ফলের জুস পান করিয়ে অচেতন করার পর তাকে হাতুড়ি দিয়ে পেটানোর চেষ্টা করেন তিনি।
এসময় কৃষ্ণা বাধা দিতে গেলে জহিরুল দুজনকেই এলোপাতাড়ি পেটায়। পরে মোমবাতি থেকে কৃষ্ণার শাড়ি ও ঘরে আগুন ছড়িয়ে যায়। রাতে দগ্ধ ও আহত কৃষ্ণাকে হাসপাতালে ভর্তির করার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
হাতুড়ি পেটায় এই দম্পতির দুই মেয়ে শোভনা ও অদিতিও আহত হন।
ঘটনার পর সীতাংশুর বড় ভাই সুধাংশু শেখর বিশ্বাস ব্যবসায়ী জহিরুলকে একমাত্র আসামি করে মোহাম্মদপুর থানায় ওই হত্যা মামলা করেন। পরে মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
হাজী আহমেদ ব্রাদার্স সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপক জহিরুল হত্যায় ‘দোষ স্বীকার’ করে এরইমধ্যে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
আসামির স্বীকারোক্তির পরও তদন্ত প্রতিবেদন দিতে দেরি করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন কাবেরীর মামা রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের কম্পিউটার ব্যবসায়ী পিন্টু বিশ্বাস।
তিনি বলেন, “হত্যার কারণ নিয়ে জহিরুল স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে হাকিমের কাছে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। সেখানে শেয়ারের টাকা পয়সার লোভে এই আক্রমণ ও হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে তথ্য দিয়েছে বলে আমি তদন্তকর্তার কাছ থেকে জানতে পেরেছি। হত্যার উদ্দেশ্য, ধরন, অভিপ্রায় ও পরিকল্পনা জলের মতো পরিষ্কার।
“এছাড়া মামলার সাক্ষী হিসাবে আমার, আমার এক বোনের এবং খুলনা ডুমুরিয়ার আমার গ্রামের একজনের জবানবন্দি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিয়েছেন। কিন্তু অভিযোগপত্র জমা দিতে এত দেরি করছেন কেন তা বুঝতে পারছি না।”
টেলিফোনে মামলার তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা দেলোয়ার নানা কথা বলে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চান।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, “খুব তাড়াতাড়িই এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেব।”
তদন্তে হত্যাকাণ্ডের কারণ, উদ্দেশ্য এবং হত্যাকারীদের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা করতে চান; বিষয়টি নিয়ে বসে কথা বলতে চাওয়ার আগ্রহ দেখান। তবে পরে কয়েক বার তাকে ফোন দিলেও তিনি আর ফোন ধরেননি।
সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Be the first to comment on "কৃষ্ণা কাবেরী হত্যা: বছর গড়ালেও তদন্ত শেষ হয়নি"