শিরোনাম

ব্যাংক খাতে বাড়ছে অতিরিক্ত তারল্য

নিউজ ডেস্ক: দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় বাড়ছে না ঋণ চাহিদা। আর আশানুরূপ ঋণ চাহিদা না থাকায় ব্যাংকগুলোর কাছে প্রচুর তারল্য জমা হচ্ছে। এর কিছু অংশ স্বল্প সুদের বন্ড ও বিলে বিনিয়োগ হলেও ব্যাংকগুলোতে অলস পড়ে রয়েছে অতিরিক্ত তারল্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ব্যাংকগুলোতে বর্তমানে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি অতিরিক্ত তারল্য জমা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে যেতে পারছে না। এছাড়া, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বিনিয়োগের জন্য খুব একটা অনুকূল নয়। এ অবস্থায় কেউই বড় ধরনের বিনিয়োগে যেতে সাহস করছে না। আর বিনিয়োগ না হওয়ায় ব্যাংকগুলোতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তারল্য জমা হচ্ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ মানবকণ্ঠকে বলেন, বিনিয়োগ করতে না পারায় ব্যাংকগুলোর কাছে উদ্বৃত্ত তারল্য জমা হচ্ছে। এসব অর্থের বিপরীতে তারা নিয়মিত সুদ গুনলেও কোনো আয় আসছে না। এমন পরিস্থিতিতে তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়ে আমানতের সুদ কমিয়ে দিচ্ছে। এতে আমানতকারীরাও সমস্যায় পড়ছে। এ অবস্থায় সরকারকে অবশ্যই বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে। যাতে দেশের ব্যবসায়ীরা নির্বিঘেœ বিনিয়োগ করতে পারেন। ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা এখনো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদায়ী ২০১৫ সাল শেষে ব্যাংকগুলোর তারল্য সংরক্ষণের প্র্রয়োজন ছিল ১ লাখ ৩৭ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলো রেখেছে ২ লাখ ৫৭ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ অতিরিক্ত তারল্য ১ লাখ ২০ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা। অথচ ওই বছরের জুনে এর পরিমাণ ছিল ৪৪ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে বিভিন্ন ব্যবসায়ী গ্রুপ বিদেশ থেকে সরাসরি সহজ শর্তে ও তুলনামূলক সুবিধাজনক সুদে বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ নিচ্ছে। যার কারণে ব্যাংকিং খাতে বেসরকারি ঋণের চাহিদা কমে গেছে। ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি ঋণ বেড়েছে মাত্র ১৪ দশমিক ১৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, তহবিল ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের লক্ষ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণের তুলনায় আমানত বাড়ানোর নজর দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে ঋণ বিতরণের পরিমাণ কিছুটা কমেছে। বিভিন্ন কারণে ব্যবসাবান্ধব পরিস্থিতি না থাকায় ব্যাংকগুলো আমানতের টাকা বেসরকারি খাতে খাটাতে না পারায় ব্যাংকের তারল্য বেড়েছে। সব মিলিয়ে ঋণ-আমানত অনুপাত কমেছে।
ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বছরের শেষ সময়ে এসে সব ব্যাংকই ঋণ আদায় করে। ফলে ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্য বেড়ে যায়। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কারণ বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে কেউ বিনিয়োগ করে লোকসান গুনতে চাচ্ছে না। ফলে ব্যাংক ঋণের প্রবাহ কমে গেছে। তবে ব্যাংকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তারল্য থাকলে তা অনুৎপাদনশীল খাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে রাষ্ট্রীয় মালিকানার সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (বিডিবিএল)  তারল্য রয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা। এই ৫ ব্যাংকের তারল্য সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল ৪১ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা। বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে তারল্য সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল ১ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা, তারল্য স্থিতি রয়েছে ১ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে ১ লাখ ৩ হাজার ৬৭ কোটি টাকার তারল্য স্থিতি রয়েছে। এসব ব্যাংকের তারল্যের প্রয়োজন ছিল ৬৯ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা। বেসরকারি ইসলামিক ব্যাংকগুলোর তারল্য স্থিতি ৩০ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা, প্রয়োজন ছিল ১৮ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। আর বিদেশি ব্যাংকগুলোতে ২১ হাজার ২২ কোটি টাকার তারল্য সম্পদ  রয়েছে। এ সময়ে বিদেশি ৯ ব্যাংকের ৬ হাজার ৯৬১ কোটি টাকার  তারল্য সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল।
এদিকে, বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ দিতে দীর্ঘদিন পর চলতি বছরের প্রথমার্ধে জানুয়ারি-জুনের মুদ্রানীতিতে রেপো ও রিভার্স রেপোর সুদহার কমানো হয়েছে। কিন্তু এর পরও বিনিয়োগ খুব একটা বাড়েনি। ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহ ও আন্তঃব্যাংক (কলমানি) মার্কেটে সুদহার নি¤œপর্যায়ে থাকায় সুদহারও দশমিক ৫ শতাংশ হারে কমানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অপর এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকগুলো গড়ে ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ সুদে আমানত নিয়েছে। কিন্তু গত বছর শেষে সেটা আরো কমে ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে আমানতের সুদহার কমার সঙ্গে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদও কিছুটা কমিয়েছে। ২০১৪ সাল শেষে ব্যাংকগুলো গড়ে ১২ দশমিক ৪৬ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করেছে। গত বছর সেটা কমে ১১ দশমিক ১৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সুদ হারের ঊর্ধ্বসীমার প্রত্যাহারে পর ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলার স্বার্থে ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) চলতি মূলধন ও মেয়াদি আমানতের ওপর সুদহার নির্ধারণ করে দিয়েছিল। তবে ঋণ বিতরণ কমে যাওয়ায় ব্যাংকের কাছে নগদ অর্থের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে। এতে মেয়াদি আমানতের ওপর বর্তমানে ৬ থেকে ৭ শতাংশ হারে সুদ দেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

সূত্র: মানবকণ্ঠ

basic-bank

Be the first to comment on "ব্যাংক খাতে বাড়ছে অতিরিক্ত তারল্য"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*