বানিয়েছেন বিএমডিসির মেয়াদোত্তীর্ণ ভুয়া সনদ ,সেজেছেন সনোলজিষ্ট
নিউজ ডেস্ক ॥ কোট টাই প্যান্ট পরে চলছেন ঠাঁটে বাটে। নেই বিএমডিসির কোন রেজিস্ট্রেশন। কখনও পড়েননি কোন মেডিকেল কলেজে। তবুও সনোলজিস্ট সেজে রোগী দেখছেন, ফি হাকাচ্ছেন। সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারের চেয়ে নিজেকে বড় ডাক্তার বুলি ছড়িয়ে আস্তানা গাড়ছেন বিভিন্ন এলাকায়। বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের একটি নকল সনদ বানিয়ে লোহাগড়ার বিভিন্ন ক্লিনিক হাসপাতাল চষে বেড়াচ্ছেন সৌমেন্দ্র নাথ বিশ্বাস নামের এই ভুয়া এমবিবিএস। বিএমডিসির প্রকৃত নিবন্ধনধারী ডাক্তারের নিবন্ধন ব্যবহার করে তিনি প্রতরণার জাল বিস্তার করে চলেছেন। লোহাগড়ার স্থানীয় প্রশাসন, সাস্থ্য বিভাগ ও উচ্ছৃংখল কয়েক রাজনৈতিক নেতাকে মোটা অংকের টাকায় ম্যানেজ করে তিনি এমবিবিএস পাশ না করেও সনোলজিষ্ট সেজে চুটিয়ে রোগী দেখছেন। আল্ট্রাসনোগ্রাম করে তিনি টেস্ট রিপোর্টও তৈরী করছেন। আর এবিষয়টি এলাকায় ফাঁস হয়ে পড়লে লোহাগড়াসহ গোটা নড়াইলে হৈচৈ শুরু হয়। এই সৌমেন যে ভুয়া ডাক্তার তার প্রমাণ বিএমডিসিও দিয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত মেবাইলকোর্ট বা পুলিশি অভিযান চালিয়ে এই প্রতারক ভুয়া ডাক্তার সৌমেনকে আটকের জোর দাবি জানিয়েছেন।
মুখে কথার ফুল ঝুরি, হাফভাব বিশাল এক মেডিকেল অফিসার। সত্যিকারের ডাক্তারের মত ভাব বজায় রেখে সপ্তাহে দু’দিন থেকে তিন দিন করে সময় দেন বিভিন্ন ক্লিনিক ও প্রাইভেট হাপাতালে। এখন আস্তানা লোহাগড়ার দ্বীপ প্রাইভেট ক্লিনিকে। এছাড়া একই এলাকা পিয়াস ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও কান্তি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আল্ট্রাসনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হিসেবে রোগী দেখে চলেছেন। এর আগে তিনি কখনও নিজেকে ভারতের পাটনা থেকে পাস আবার কখনও চায়না থেকে পাশ বলে এলাকায় বলে আসছেন।
বিভিন্ন ক্লিনিক হাসপাতাল থেকে ধাওয়া খেয়ে লোহাগড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান গেটের সামনে দ্বীপ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আস্তানা গাড়েন তিনি। বিষয়টি খোজ খবর নিয়ে সংবাদ প্রকশের জন্য সাংবাদিকদের কাছে এলাকাবাসীর দবি আসে। দাবীর প্রেক্ষিতে সরেজমিনে এ প্রতিবেদক খোজ খবর নিতে যান। দেখা গেল এই ভুয়া সৌমেন্দ্রনাথ চেয়ারে বসে আল্ট্রাসনোগ্রাম করছেন। অর্ধশত রোগীর লাইন। তাকে বিশাল সনোলজিস্ট বলে পরিচিতি করে দিচ্ছে মালিক পক্ষ। তথ্যানুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এমবিবিএস না হয়েও বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের একটি ভুয়া প্যাড সিল বানিয়ে স্বাক্ষর দিয়ে নিজেকে রেজিষ্ট্রেশন ধারী সত্যিকারের এমবিবিএস ডাক্তার সনোলজিস্ট পরিচয় দেয়া শুরু করেন কয়েক বছর আগে থেকে। এই প্রতিবেদকের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে আমতা আমতা শুরু করেন তিনি। এক সময় রোগী সরিয়ে দিয়ে বলেন সব কাগজ বাসায় রয়েছে। ১৫-২০ মিনিট পরে কিছু কাগজপত্র উপস্থাপন করেন তিনি। লোহাগড়া এলাকার কয়েকটি কম্পিউটার থেকে তৈরি করা কিছু কাগজ দেখান তিনি। এরপর তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের রেজিষ্ট্রেশন বলে একটি সনদ উপস্থাপন করেন। যার রেজিষ্ট্রেশন নম্বর ৭৬৭৩৯। নাম সৌমেন্দ্রনাথ বিশ্বাস। গ্রাম স্বরুপপুর উপজেলা চৌগাছা, জেলা যশোর। মজার ব্যাপার এই নম্বর নিয়ে বিএমডিসিতে যোগাযোগ করা হলে থলের বেড়াল বেরিয়ে পড়ে। বেরিয়ে আসে এই প্রতারক আসলেই একজন ভন্ড। এই রেজিষ্ট্রেশন মুলত মোঃ আশরাফুল রহমান নামে একজন প্রকৃত ডাক্তারের। তিনি সিলেট জেলার জৈন্তাপুরের খইঘরের আব্দুল কাদের’র ছেলে। এই আশরাফুর রহমানের রেজিষ্ট্রেশন নম্বর সংগ্রহ করে নিজে ভুয়া সিল প্যাড বানিয়ে ডাক্তার সেজে প্রতারণা করে যাচ্ছেন।
সৌমেন্দ্রনাথ চায়না থেকে পাশ করেছেন কিন্ত কাগজ দেখাতে ব্যর্থ হন। আবার বিএমডিসির আইটি সেকশন থেকে বলা হয়েছে সৌমেন যে কাগজ দেখাচ্ছেন সেটি কখনও বিএমডিসি সরবরাহ করেনা। সৌমেন নিঃসন্দেহে একজন ভুয়া ডাক্তার, তাকে আটক করে পুলিশে দেয়া যে কোন নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। সৌমেন’র সাথে কথা বলে বের হওয়ার কয়েক মিনিট পরেই তিনি গা ঢাকা দেন। সাংবাদিকদের তথ্যে মোবাইল কোর্ট আসতে পারে ভয়ে সাময়ীকভাবে পালিয়ে যান তিনি। এরপর লোহাগড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে চা খেতে বসলে হাসপাতালের কয়েকজন স্টাফ জনান, ভুয়া চিকিৎসক সৌমেন্দ্রনাথ বিশ্বাস দীর্ঘ দিন এমবিবিএস (সিএমইউ) কখনো ডাঃ এস এন বিশ্বাস, কখনো ডাঃ সৌমেন্দ্র নাম ব্যবহার করে নির্বিগ্মে চালিয়ে যাচ্ছেন রোগী সেবার নামে প্রতারনা ব্যাবসা। লোহাগড়া উপজেলা শহরের দশ থেকে বারটি ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে বসে নিয়মিত রোগী দেখেন, এবং আল্ট্রাসনোগ্রাম ও প্যাথলজিক্যাল রিপোর্ট প্রদান করেন। স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে দিনের পর দিন সহজ সরল রোগীদের সাথে প্রতারনা করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার ভুল রিপোর্ট আর অপচিকিৎসা দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। এই প্রতারকের অধীনে রয়েছে ডজনখানেক দালাল। ভদ্র বেশী দালালরাই তার গুনকীর্তন করে প্রচার করে থাকেন সৌমেন বিশাল বড় ভাল ডাক্তার।
তাছাড়া সন্ত্রাসী বাহিনীর সাথে কথিত এই ডাক্তারের গভীর সখ্যতা রয়েছে। কোন রোগীর প্রকৃত সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে প্রতিবাদ করলে দ্রুত চলে আসে পোষা দালাল আর সন্ত্রাসীরা। তারা এসে সবকিছু সামাল দেন। জানা যায় আয়ের অর্ধেক টাকা তিনি দালাল, উচ্ছৃংখল যুবক, স্থানীয় প্রশাসনকে দেন। আর ম্যানেজ প্রক্রিয়ায় তিনি দীপ ডায়াগনস্টিক ছাড়াও লোহাগড়ার কান্তি, পিয়াস, মেহেদী, মডেল, লোহাগড়া, সেবা, আল্লারদান, উপশম, মিজানুর নার্সিং হোম,ও সিটি ডায়াগনষ্টিক সেন্টার সহ ১০/১২টি ক্লিনিক ও ডায়াগোনষ্টিক সেন্টারে আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্ট করে থাকেন। এদিকে সৌমেনের দেয়া রেজিস্টেশন নম্বর ৭৬৭৩৯ নিয়ে কথা বলা হয় বিএমডিসিতে। তথ্য মিলে আসলে সৌমেন ভুয়া। রেজিষ্ট্রেশন নম্বর ৭৬৭৩৯ ডাক্তার আশরাফুর রহমানের। আর এটি ব্যবহার করে প্রতারণা করে যাচ্ছেন সৌমেন। সে কোন ডাক্তারই নয় সনোলজিস্ট তো দুরের কথা। আবার বিএমডিসি বলছে বাংলাদেশের বাইরে মেডিকেল পড়তে গেলেও অনুমোদন লাগবে। এব্যাপারে কথা হয় নড়াইলের সিভিল সার্জনের সাথে। তিনি জানান এমন অভিযোগ যদি সঠিক হয় তাহলে সৌমেন নামে ব্যক্তিটি যা করছেন তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ভুয়া সনদ নিয়ে বা অন্যর সনদ দিয়ে ডাক্তারি একটি কলংকজনক বিষয়। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ব্যাপারে তিনি জেলা প্রশাসক ও লোহাগড়া উপজেলা নিবার্হী অফিসারের সাথে কথা বলবেন।
কথা হয় লোহাগড়া উপজেলা নিবার্হী অফিসার মনিরা পারভীনের সাথে। তিনি জানান, এধরণের অভিযোগে অবশ্যই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। সৌমেন নামে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে তার সরবরাহ করা ভুয়া কাগজপত্র ও বিএমডিসির ওয়েব সাইটের আসল ডাক্তারের কাগজপত্র তার দপ্তরে পাঠানোর কথা বলেন তিনি। কাগজপত্র হাতে পেলে আর সৌমেন ভুয়া প্রমাণিত হলেই তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।

Be the first to comment on "লোহাগড়াসহ বিভিন্ন এলাকা চষছেন ভুয়া ডা. সৌমেন"