শিরোনাম

রাজশাহীতে অধ্যাপক হত্যা, সরব ছিল না ঢাকা

নিউজ ডেস্ক: সন্দেহভাজন মৌলবাদীদের হাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ প্রধান রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর দৃশ্যমান তৎপরতা ছিল না রোববার।

ঘটনার প্রায় ৩৫ ঘণ্টা পর তার বিদেহি আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। অবশ্য সোমবার ক্যাম্পাসে মানববন্ধন করবে বলে রাতে জানিয়েছে তারা।

হত্যাকাণ্ডের পর দৃশ্যত নিশ্চুপ থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সংগঠনের পক্ষ থেকে রোববার সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটের দিকে ফ্যাক্সযোগে গণমাধ্যমে আসা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

ওই বার্তায় নিহত শিক্ষকের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদও জানানো হয়। সেই সঙ্গে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকারীদের খুঁজে বের করে অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার এবং দ্রুত বিচারসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন শিক্ষকরা।

শনিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে নিজের বাড়ি থেকে মাত্র ৫০ গজ দূরে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ইংরেজি বিভাগের এই শিক্ষককে। মোটর সাইকেলে আসা দুই যুবক তাকে কুপিয়ে পালিয়ে যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে পুলিশ।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস হত্যার দায় স্বীকার করেছে বলে খবর দিয়েছে জঙ্গি হুমকি পর্যবেক্ষণকারী এক ওয়েবসাইট। আইএসের দাবি উড়িয়ে দিলেও পুলিশ জঙ্গি গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার সন্দেহের কথা বলেছে।

ঢাবি শিক্ষক সমিতির বিজ্ঞপ্তিতে গত এক যুগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চার শিক্ষক হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের উপর হামলার কথাও তুলে ধরা হয়।

“একের পর এক ন্যক্কারজনক হত্যাকাণ্ড চালিয়ে আসছে তারা (জঙ্গি গোষ্ঠী)। একটি হত্যাকাণ্ডেও এখন পর্যন্ত কোনো বিচার হয়নি।”

“অতীতের হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার না হওয়ায় জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো লাগামহীনভাবে তাদের হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে এবং তাদের আস্ফালন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি, শুধুমাত্র সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রদান করে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা সম্ভব হবে।”

অধ্যাপক রেজাউল হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে উত্তাল ক্যাম্পাসে রোববার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ মিজানউদ্দিন বলেন, “যেভাবে শিক্ষক ও মুক্তমনাদের হত্যা করা হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে এবার আমাদের সবাইকে হত্যা করা হবে।”

সহকর্মী হত্যাকাণ্ডের পর রাজধানীতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের দৃশ্যমান তৎপরতা না থাকার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নেই। এটা দর্শনের দারিদ্র্য।

“এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের কথা আর কী হতে পারে, একজন শিক্ষক চাপাতির আঘাতে মারা যাবেন, আর আমরা নির্বিকার থাকব-এটা কেমন কথা?”

“প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে মুক্তচিন্তার সঙ্গে অশ্লীলতার তুলনা করেন-এটা ভিন্ন বার্তা দেয়,” বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক এই সভাপতি।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক মেজবাহ কামাল বলেন,  “এই ঘটনায় সারা দেশেই প্রবল ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সবাই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে। আমি সেটাই শুনেছি। সবাই আলোচনা করছেন, তাকে কেন মারা হলো, তিনি নিরীহ সাধারণ শিক্ষক ছিলেন। এটা ব্যক্তিগত শত্রুতার বিষয় নয়। এটা রাজনৈতিক।”

তৎপরতার বিষয়ে তিনি বলেন, “রেসপন্সটা ভেতরে ভেতরে আছে। বহিঃপ্রকাশ হবে।”

ঢাকার মতোই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি মঙ্গলবার এক ঘণ্টা কর্মবিরতি পালন করে মানববন্ধনের কর্মসূচি দিয়েছে।

রাবি অধ্যাপক হত্যাকাণ্ড নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কেউই আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেননি। প্রায় দেড় বছর আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক অধ্যাপক শফিউল ইসলামের হত্যাকাণ্ডে শোক প্রকাশ করে দলটির শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রতিক্রিয়া এসেছিল।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল আলম হানিফ  বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধ শক্তি বিচারের বিরুদ্ধে গিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে চায়। তারা বিভিন্ন নাম দিয়ে এভাবে কৌশলীভাবে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে। এই হত্যাকাণ্ডের আমরা তীব্র নিন্দা জানাই।

“দ্রুত পদক্ষেপ এই হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়েছি।”

হত্যাকাণ্ডের ৩৬ ঘণ্টার বেশি সময় পর এক বিবৃতিতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিন্দা জানিয়ে বলেন, “ভোটারবিহীন সরকারের দুষ্কর্মের কারণেই দুষ্কৃতকারীরা আস্কারা পাচ্ছে এবং সেই কারণেই জীবনবিনাশী কর্মকাণ্ডের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দিনভর এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর মিছিল-সমাবেশ দেখা যায়নি।

ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি লাকী আক্তার বলেন, “রেজাউল করিম সিদ্দিকী স্যারের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিকালে শাহবাগে একটি নাগরিক সমাবেশ ছিল। ছাত্র ইউনিয়ন এবং প্রগতিশীল ছাত্রজোটের অন্যান্য সংগঠন এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে।”

তিনি জানান, তনু হত্যা ও সারা দেশের হত্যা ধর্ষণের প্রতিবাদে সোমবারের আধা বেলা হরতালেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের বিষয়টা যুক্ত করা হয়েছে।

এই হত্যাকাণ্ডের পর ছাত্রলীগ কোনো কর্মসূচি দিয়েছে কি না- জানতে চাইলে সংগঠনটির সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ

বলেন, “শিক্ষক-সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গে কাজ করি। ঘটনার পর আমরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই কাজটি করছি।”

ঢাকায় কোনো কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে কি না- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমরা এই ঘটনার নিন্দা জানাচ্ছি, জড়িতদের শাস্তির দাবি করছি। জড়িতদের গ্রেপ্তারের বিষয়টার দায়িত্ব আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। তারা সেটা করছে।”

বর্তমানে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের বাইরে প্রগতিশীল ছাত্রজোটভুক্ত সংগঠনগুলোই সবচেয়ে সক্রিয় রয়েছে। বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলের ক্যাম্পাসে প্রকাশ্য সাংগঠনিক তৎপরতা নেই।

এই হত্যাকাণ্ডের পর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসানের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগে চেষ্টা করলে তার ব্যক্তিগত নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। ভাইবারে রিং হলেও তিনি ধরেননি।

সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

basic-bank

Be the first to comment on "রাজশাহীতে অধ্যাপক হত্যা, সরব ছিল না ঢাকা"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*