নিউজ ডেস্ক : বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনন্য মাইলফলক হবে ক্ষমতাসীন দলের ২০তম জাতীয় সম্মেলন।
ঐতিহ্য ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে নবীন-প্রবীণদের সংমিশ্রণে আগামীর নেতৃত্ব সাজানোর পরিকল্পনায় দলটির হাইকমান্ড। ‘উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে চলেছি দুর্বার, এখন সময় বাংলাদেশের মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার’ এই শ্লোগানকে সামনে রেখে দেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ তার ২০তম জাতীয় সম্মেলন করতে যাচ্ছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনকে টার্গেট করেই ত্যাগীদের সামনে রেখে ঢেলে সাজানোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। এবারের সম্মেলনে দেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রের পরিবর্তন, কেন্দ্রীয় কমিটির আকার বৃদ্ধি আর নতুন পদ সৃষ্টিসহ সম্ভাব্য বেশ কিছু পরিবর্তন আসছে। কাউন্সিলের তারিখ ঘোষণার পর থেকেই বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠেছেন দলের নেতাকর্মীরা। গুরুত্বপূর্ণ পদে কোনো পরিবর্তন আসছে কিনা তা নিয়ে নেতারা মুখ না খুললেও কর্মীদের মধ্যে এ নিয়ে চলছে নানা গুঞ্জন।
তবে নেতারা বলছেন সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণভাবে এবং উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে উৎসবের আমেজে অনুষ্ঠিত হবে এবারের সম্মেলন। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, গঠনতন্ত্রে কিছু পরিবর্তন আসবে। এর আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় হতো। তাই গঠনতন্ত্রে এ বিষয়ে কিছু উল্লেখ ছিল না। এবার এ বিষয়টি যোগ হবে। পাশাপাশি কমিটির আকারে কিছুটা পরিবর্তন আসবে। হানিফ আরও বলেন, আগামী দিনের আওয়ামী লীগের লক্ষ্যকে সামনে রেখে পার্টির কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হবে। আওয়ামী লীগ এমন একটি রাজনৈতিক সংগঠন এখানে যোগ্যতা-দক্ষতার মূল্যায়ন হয়। নিষ্ঠার সঙ্গে যার যার দায়িত্ব পালন করলে অবশ্যই পদোন্নতি হবে। আবার দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে বাদও পড়তে হবে।
একই সঙ্গে দলের জাতীয় সম্মেলনে দেশ ও দলের ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরার প্রয়াস থাকবে। উৎসবপূর্ণ সম্মেলনকে ঘিরে সমগ্র নগরী থাকবে ব্যাপক নিরাপত্তার বলয়ে ঘেরা। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদ মোকাবেলা এবং ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত দেশে পরিণত করতে বেশ কিছু ঘোষণা আসতে পারে বলেও সূত্রে জানা গেছে। আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ দলের জাতীয় সম্মেলন নিয়ে বলেন, অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এবারের সম্মেলন হবে ভিন্ন ধাঁচের। দলের ইতিহাস-ঐতিহ্য সাংস্কৃতিকভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি থাকবে নানান চমক। দলটির আসন্ন সম্মেলনে টাকার প্রভাবশালীদের মূল্যায়ন না করে দলীয় কর্মকান্ডে নিবেদিত ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়নের প্রত্যাশা তৃণমূল নেতা কর্মীদের। দলের একাধিক সিনিয়রদের ধারণা মতে এবারের সম্মলনের মুল আকর্ষণ হতে পারে শেখ হাসিনা তনয় সজিব ওয়াজেদ জয় ও শেখ রেহানার পুত্র রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি। আসন্ন সম্মেলনের মধ্য দিয়ে শেখ রেহানার পুত্র ববি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে আসতে পারে এমন ইঙ্গিত মিলেছে একাধিক সুত্রে।
আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার মতে, ববিকে কমিটিতে যুক্ত করা হতে পারে। বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানার সন্তান ববি দীর্ঘদিন ধরে দেশে অবস্থান করে সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের (সিআরআই) নানা কাজের তত্ত্বাবধান করছেন। এসব কাজে তিনি সফলতাও দেখিয়েছেন। তবে ববি তাঁর পৈত্রিক আবাসস্থল রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বনানী ও গুলশান নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৭ এলাকা থেকে কাউন্সিলর হিসেবে জাতীয় সম্মেলনে যোগ দিতে পারেন। অপরদিকে, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগের সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন। ধানম-িতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে গতকাল এ কথা জানান দলটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ। হানিফ বলেন, রংপুর জেলার কাউন্সিলর হিসেবে জাতীয় সম্মেলনে যোগ দেবেন সজিব ওয়াজেদ জয়। আওয়ামী লীগের রংপুর বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন দফতর উপ-পরিষদ আহ্বায়ক ওবায়দুল কাদের।
দলীয় একটি সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সম্প্রতি সত্তরে পা দিয়েছেন। এখন বঙ্গবন্ধুর তৃতীয় প্রজন্মকে ধীরে ধীরে দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় করা প্রয়োজন। শেখ হাসিনার একমাত্র ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার। তিনি এখন সে কাজেই বেশি ব্যস্ত। মা প্রধানমন্ত্রী থাকাবস্থায় তিনি সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হতে এবং দেশে থাকতে চান না। নিজেকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতেই তাঁর এমন মনোভাব। এ ক্ষেত্রে দেশে অবস্থানরত ববিকে দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত করা হতে পারে। ববির ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রে জানা যায়, সরাসরি দলীয় রাজনীতি এবং জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে ববি এখনো নিজেকে পুরোপুরি প্রস্তুত বলে মনে করেন না। বিভিন্ন সময়ে তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের এমনটা জানিয়েছেন। তবে তিনি রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বনানী ও গুলশান নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৭ আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বিষয়ে মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে আগামী নির্বাচনেই যে তিনি অংশ নেবেন সেটি নিশ্চিত নয়।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সিনিয়র এক নেতা বলেন, শেখ হাসিনা তাঁর নিজের সন্তান ও বোনের সন্তানদের সমান দৃষ্টিতে দেখেন। তিনিই সিদ্ধান্ত নেবেন বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্ররা কে কখন কোথায় কী কাজ করবেন। তাঁদের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে একমাত্র নেত্রীই (শেখ হাসিনা) ভালো জানেন। তবে জয় বা ববি যখনই সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হবেন, আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা তাঁদের স্বাগত জানাবে। বিভিন্ন স্তরের নেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তন না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে সভাপতিমন্ডলী ও সম্পাদকমন্ডলীতে এসব পরিবর্তন আসবে। দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সভাপতিমন্ডলীতে নতুন ৯ জন সদস্য যুক্ত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
এ ছাড়া সম্পাদকমন্ডলীতে অন্তত ১৫টি পদে পরিবর্তন আসতে পারে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য সংখ্যা ১৫। এর মধ্যে দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদাধিকার বলে সভাপতিমন্ডলীর সদস্য। সম্মেলন সামনে রেখে দলের গঠনতন্ত্র সংশোধনের লক্ষ্যে গঠিত সাব-কমিটি সূত্রে জানা যায়, আগামী সম্মেলনে সভাপতিমন্ডলীর সদস্যসংখ্যা ৪টি বাড়িয়ে ১৯ করার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলনের পর গঠিত কমিটিতে সভাপতিমন্ডলীর দুটি পদ শূন্য রাখা হয়েছিল। আর সভাপতিমন্ডলীর সদস্য সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন মারা গেছেন। ফলে বর্তমান কমিটিতে সভাপতিমন্ডলীর তিনটি পদ শূন্য রয়েছে। এ ছাড়া আগামী কাউন্সিলে সভাপতিমন্ডলীর দুজন সদস্য বাদ পড়তে পারেন। ফলে সব মিলিয়ে সভাপতিমন্ডলীতে নতুন অন্তর্ভুক্ত হবেন ৯ জন।
দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্র মতে, আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীতে নতুন করে যাঁদের যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি তাঁদের মধ্যে আছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ফুপাতো ভাই ও সাবেক চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন ও ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান। এই তিনজনই বর্তমানে দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য। এ ছাড়া সভাপতিমন্ডলীতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা আছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী, খুলনা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া এবং দলের দুই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ ও দীপু মনির। সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য মুহম্মদ ফারুক খান, ড. আব্দুর রাজ্জাক, আসাদুজ্জামান নূর, নুরুল ইসলাম নাহিদেরও সভাপতিমন্ডলীতে স্থান পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভূমিমন্ত্রী ও পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শামসুর রহমান শরিফ ডিলুকেও দেখা যেতে পারে সভাপতিমন্ডলীতে।
প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ২৯ ডিসেম্বর সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ক্ষমতাসীন দলটির। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ২০১৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি দলের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে সম্মেলনের তারিখ ২৮ মার্চ নির্ধারণ করে কমিটির মেয়াদ ছয় মাস বাড়ানো হয়। এরপর আরও দু’বার পেছানো হয় সম্মেলনের তারিখ। সম্প্রতি দলের সভানেত্রীর সঙ্গে সম্মেলন বাস্তবায়ন কমিটির বৈঠকে পুনরায় দিন ঠিক করা হয়। জানা গেছে, আগামী সম্মেলনের মূল টার্গেট দলকে সর্বাত্মক গোছানো। রাজপথের যেকোন আন্দোলন ও বিরোধীদল মোকাবিলায় রাজপথের সাহসী নেতাদের সামনে নিয়ে আসা। সম্মেলনে যে নতুন কমিটি হবে, নতুন যে নেতৃত্ব বেরিয়ে আসবে, সেই নেতাদের আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিরোধী দলগুলোকে মোকাবিলা করাসহ চলমান পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে ধারণা করেই সম্মেলনে বড় ধরনের চমক দিতে চান দলটির হাইকমান্ড।
এসব বিষয় সামনে রেখেই দলীয় পদ-পদবিতে উল্লেখযোগ্য রদবদলের সম্ভাবনা না থাকলেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে সম্মেলনের মাধ্যমে দলটিতে। জাতীয় এ সম্মেলনকে সামনে রেখে মূল্যায়ন বিবেচনায় কেন্দ্রীয় নেতাদের আমলনামা এখন দলটির সভাপতির টেবিলে। তিনি দলের নেতাদের বিগত দিনের কর্মকান্ড চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন। গভীর নজরধারী করছেন সমালোচিত কয়েক নেতাকে। দলটির সাধারণ সম্পাদক পদে তৃণমূল নেতাকর্মীদের একটি অংশ নতুন মুখের প্রত্যাশা করছেন। কিন্তু অনেকটা নিশ্চিত বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামই আগামী কার্যনির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক হচ্ছেন। বহুল আলোচিত ও প্রতীক্ষিত ২০তম এ সম্মেলনর তারিখ পরপর তিনবার পিছিয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আগামী ২২ ও ২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে। ক্ষমতাসীন এ দলটির জাতীয় সম্মেলনে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালীসহ বেশি সংখ্যক বিদেশী মেহমান যোগদানের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল : রংপুরে জয় ঢাকায় ববি

Be the first to comment on "আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল : রংপুরে জয় ঢাকায় ববি"