শিরোনাম

আওয়ামী লীগের তৃণমূলে ভাঙন না নতুন জেনারেশন!

নিউজ ডেস্ক: ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের তৃণমূলে ভাঙন শুরু হচ্ছে। হাইব্রিড আর ত্যাগীদের দ্বন্দ্বে বিভিন্ন স্থানে অভিমানে দল ছাড়ছেন অনেক ত্যাগী নেতা। দীর্ঘদিন ধরে যারা ইউনিয়ন পর্যায়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে ছিলেন এসব নেতাই এখন দলত্যাগী হচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, এমপি ও উপজেলার নেতাদের স্বজনপ্রীতি আর বাণিজ্যিক মনোভাবের কারণে তারা অবমূল্যায়িত হচ্ছেন।
তবে দলের শীর্ষপর্যায়ের নেতারা বিষয়টিকে হালকাভাবেই দেখছেন। তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ এ ভূখণ্ডের বৃহৎ দল। এক এক সময় নতুন জেনারেশন আসছে। আবার পুরনোরা নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন। এখনো ঠিক সারাদেশেই নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে একটি নতুন জেনারেশন তৈরি হচ্ছে।
নির্বাচনে টাকার ছড়াছড়ি কিংবা দলের মনোনয়ন বাণিজ্যের বিষয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডের আরো একটি মূল্যায়ন হচ্ছে সারাবিশ্বে যেভাবে পুঁজির প্রভাব বাড়ছে তার থেকে বাংলাদেশ কিংবা আওয়ামী লীগেরও বের হওয়ার সুযোগ নেই। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও এর প্রভাব পড়েছে। রাজনীতিতে ব্যবসায়ী গ্রুপ এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক চেম্বারগুলোর প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দলের নেতারা বলছেন, তারপরও আওয়ামী লীগই একমাত্র দল যেখানে ত্যাগীদের মূল্যায়ন হয়।
কিন্তু যে অভিযোগটি গত দু’-এক বছর ধরেই আওয়ামী লীগকে বিদ্ধ করছে তা হলো দলে ভিন্ন মতাবলম্বীদের ঠাঁই করে দেয়া হচ্ছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে পরে দলে দলে বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মীরা আওয়ামী লীগে প্রবেশ করেছে। পরে উপজেলা নির্বাচন ও পৌর নির্বাচনেও কিছু স্থানে দলে নতুন আগন্তুকদের মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। তখন দেশজুড়ে সমালোচনার মুখে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছিলেন, অন্য দলের কাউকে যেন আওয়ামী লীগে নেয়া না হয়। দলীয় ভিত্তিতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু হলে এ আলোচনাটি আরো বেশি করে সামনে চলে আসে। সারাদেশেই অভিযোগ ওঠে মনোনয়ন বাণিজ্যের। বিএনপি-জামায়াতের লোকজনকে নৌকা প্রতীক দেয়া হচ্ছে। মাদারীপুর, বরগুনা, কক্সবাজার, লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন জেলায় বিএনপি থেকে আগত এবং রাজাকারপুত্রদের মনোনয়ন দেয়া হচ্ছে এমন অভিযোগ রয়েছে। আর মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে সারাদেশেই। বিষয়টি এখন ওপেন-সিক্রেট। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত বিস্তৃত এ বাণিজ্য। সংসদ ভবনেও অনেক এমপি ‘চেম্বার’ খুলে বসেছেন। প্রার্থীরা সব আসছেন এমপির কাছে। যদিও কাগজে বলা আছে মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় এমপির খবরদারি নেই।
মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় বাণিজ্যের চিত্রটি এমন স্থানীয়ভাবে কাউন্সিলরদের ভোট পেতে শুরু থেকেই তাদের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে ভোট কিনতে হয়। যাদের টাকা নেই কিন্তু দলের প্রতি ত্যাগ আছে তারা ভোট কিনে নির্বাচনে আসতে পারেন না। তারপর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ। তারপর উপজেলা-জেলা, সংশ্লিষ্ট এমপি সবাইকে ম্যানেজ করে মনোনয়ন নিতে হয়। টাকার পাশাপাশি নেতাদের মাইম্যান না হলে মনোনয়ন জোটে না। স্থানীয় এমপিরা কেন্দ্রে তদবির করে তার নিজের লোকদের মনোনয়ন পাইয়ে দেন। অনেক সময় কেন্দ্রীয় নেতাদেরও টাকায় ম্যানেজ করতে হয়।
টাকায় না পেরে ত্যাগীরা কেন্দ্রে আসেন অভিযোগ নিয়ে। আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমণ্ডির কার্যালয়ে। দলের দফতর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ এসব অভিযোগ সংগ্রহ করেন। প্রতি ধাপে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে ধানমণ্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে অভিযোগের পাহাড় জমে। এত অভিযোগ একা দলের দফতর সম্পাদক সামলাতে না পারার কারণে, এখন বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদেরও অভিযোগ গ্রহণের দায়িত্ব দিয়েছে হাইকমান্ড। ঢাকায় দলীয় কার্যালয়ে চাপ কমাতে ফোনেও অভিযোগ নেয়া হচ্ছে।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় হাইকমান্ড তৃণমূলের অনেক সুপারিশ বাতিল করে দেন। কুড়িগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নিজের ইউনিয়নে তার ছেলেকে প্রার্থী করে কেন্দ্রে নাম জমা দেন। কিন্তু কেন্দ্র সেখানে প্রার্থী পরিবর্তন করেছে। ঠাকুরগাঁও জেলার এমপি দবিরুল ইসলাম প্রার্থী হিসেবে ফ্রিডম পার্টির একজনের নাম পাঠান; কেন্দ্র সেখানে প্রার্থী পরিবর্তন করে। এর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশের বিরুদ্ধেও মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।
নৌকা পাওয়ার লড়াই শেষে জমে ওঠে কোন ম্যাকানিজমে প্রার্থীকে জিতিয়ে আনা যায়। এজন্য প্রশাসনকে ব্যবহার করা হয় টাকার বিনিময়ে। মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজংয়ের একটি ইউনিয়ন পরিষদে নৌকা প্রতীক না পেয়েও তিনি প্রার্থী হয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, নৌকা প্রতীক পেলেই পাস এই ভাবনার জন্যই আজ এত সহিংসতা। আমি এক দুর্বল গরিব প্রার্থী। আমার মনোনয়ন প্রত্যাহারের জন্য এমন কোনো হুমকি ধমকি  নেই যা দিচ্ছে না।
উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে নির্বাচনী সহিংসতা ও কারচুপি তেমন হচ্ছে না। সেখানে বিএনপি ও জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ। রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলায় দ্বিতীয় দফা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের ভরাডুবি হয়েছে। কারণ হিসেবে দলের অনেক নেতা বলছেন, প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল ছিল। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ এনে ইতিমধ্যে পদত্যাগ করেছেন উপজেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এমদাদুল হক। তিনি অভিযোগ করেন, তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মতামত উপেক্ষা করে স্বজনপ্রীতি ও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে দলীয় প্রার্থী নির্বাচন করা হয়। বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থীর সহোদরকে করা হয়েছে আওয়ামী লীগের প্রার্থী।
ভুরুঙ্গামারী উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের মধ্যে ছয়টিতে পরাজিত হয় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। এগুলোর মধ্যে তিনটিতে বিজয়ী হয়েছে জাতীয় পার্টি, দুটিতে বিএনপি এবং একটিতে বিজয়ী হয়েছে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহজাহান সিরাজ বলেন, প্রার্থী বাছাইয়ে কিছুটা ভুল ছিল। দু-একটি ইউনিয়নে নেতারা ঠিকমতো কাজ করেননি। এসব কারণে ফল খারাপ হয়েছে।
আগামী ২৩ এপ্রিল ভোট হবে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলায়। সাতটি ইউনিয়ন পরিষদে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগ-সমর্থিত বর্তমান চেয়ারম্যানরা। উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের মধ্যে আটটিতেই বর্তমান চেয়ারম্যানরা আওয়ামী লীগের সমর্থনে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর মধ্যে একজন দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। বাকি সবাই প্রভাবশালী বিদ্রোহী প্রার্থী। হয়তো তারাও বহিষ্কার হবেন। এভাবে সারাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ত্যাগী নেতারা কোণঠাসা হয়ে দলবিমুখ হয়ে যাচ্ছেন।
দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মাত্র ১৪৯ ভোটে পরাজিত হয়ে ক্ষোভ-দুঃখে দুধ দিয়ে গোসল করে রাজনীতি থেকে চিরবিদায় ও ভবিষ্যতে নির্বাচন না করার ঘোষণা দিয়েছেন টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার অলোয়া ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ও সদ্য সাময়িক বহিষ্কৃত ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. রহিজ উদ্দিন আকন্দ। মনোনয়ন না দিয়ে আবার ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে তাকে পরাজিত করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
চতুর্থ ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ভাঙচুর মামলার প্রধান আসামিকে চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন দিয়েছে আওয়ামী লীগ। মনোনয়ন পাওয়া মো. তোফাজ্জেল হোসেন ওরফে গেন্দু কাজী বিএনপি থেকে সদ্য আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন। এ নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মাদারীপুর জেলা আদালতে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। এছাড়াও ১৯৯৩ সালের একটি হত্যা মামলায় তিনি সাজাভোগ করেছেন। তৃণমূলের ভোটেও এ প্রার্থী ছিলেন দুই নম্বরে।
বিগত নির্বাচনে যেসব নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগের নতুন এমপি নির্বাচিত হয়েছেন, মূলত এসব এমপি নিজের বলয় তৈরি করার জন্য দল-মত নির্বিশেষে বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে মাইম্যানের পাল্লা ভারি করছেন। এভাবেই নতুন জেনারেশন (!) তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন জেলা-উপজেলায়। বঞ্চিত হচ্ছেন ত্যাগীরা।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী মনে করেন, এসব ক্ষোভ-বঞ্চনার মধ্য দিয়ে তৃণমূলের রাজনীতিতে সাময়িক শিথিলতা আসতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী কোনো বিপর্যয় আসবে না। তিনি বলেন, শুরুতে সবাই নির্দলীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছিল। রাজনীতিকে একটি সিস্টেমে নিয়ে আসতে সরকার প্রথমবারের মতো দলীয়ভাবে এ নির্বাচনের আয়োজন করে। প্রতিটি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের ৫ থেকে ১০ জন যোগ্য প্রার্থী রয়েছে। যে কোনো একজনকে বেছে নিলে বাকিরা নিজেদের বঞ্চিত মনে করে। প্রথমবার দলীয়ভাবে হওয়ায় এমনটা মনে হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরো সিস্টেমেটিক (ভাল প্রক্রিয়ায়) প্রার্থী বাছাই হবে।
তবে সারাদেশে খোঁজ নিয়ে যে চিত্র দেখা যায়, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা তৃণমূলে ভাঙনের আশঙ্কা ফুৎকারে উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করলেও তৃণমূলের ক্ষোভ দৃশ্যমান হচ্ছে বিভিন্নভাবে। দুঃসময়ে পড়লে দলকে ভোগান্তিতে পড়তে হতে পারে। দীর্ঘদিনের নৌকার সারথিরা দুধ দিয়ে গোসল করে আওয়ামী লীগ ছাড়া শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রার্থী বাছাইয়ে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগকে আরো সচেতন ও সক্রিয় হতে হবে। ক্ষমতার স্বাদ তৃণমূলের দীর্ঘদিনের নৌকার সারথিরাই পাক।

সূত্র: মানবকণ্ঠ

basic-bank

Be the first to comment on "আওয়ামী লীগের তৃণমূলে ভাঙন না নতুন জেনারেশন!"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*