নিউজ ডেস্ক: আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে নিত্য বেড়ে যাওয়া সামাজিক অপরাধ প্রবণতা আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। উন্মুক্ত আকাশ সংস্কৃতি, পাশ্চাত্যের মূল্যবোধগুলোর আংশিক বা বিকৃতভাবে গ্রহণ এবং বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক এ ধরনের অপরাধের জন্ম দিচ্ছে। যা মানুষের মাঝে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে।
গত কিছুদিন যাবত সংঘটিত একাধিক ঘটনা সমাজবিজ্ঞানীদেরও ভাবিয়ে তুলেছে। তারা মনে করছেন, চলমান সামাজিক অস্থিরতা রাষ্ট্রকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলতে পারে। সম্প্রতি রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে ময়লার ভাগাড়, ড্রেন, রাস্তা বা কবরস্থানের পাশের নির্জন জায়গায় পাওয়া গেছে একাধিক নবজাতকের লাশ। এমনকি নির্জন স্থানে ফেলে যাওয়া জীবন্ত নবজাতককে কুকুরের মুখ থেকেও উদ্ধার করা হয়েছে। জানা গেছে, অবৈধ সম্পর্কের সূত্রে জন্ম নেয়া সন্তানের কারণে লোকলজ্জার ভয়ে এসব নবজাতককে ফেলে দেয়া হচ্ছে রাস্তায় বা ময়লার ভাগাড়ে। অনেক সময় ফুলের মতো নিষ্পাপ নবজাতকের গলাকাটা লাশ মিলছে।
পুলিশ বলছে, নবজাতকের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় কোনো বাদী-বিবাদী থাকে না। আর ঘটনাগুলো ক্লুলেস (সূত্রবিহীন) হওয়ায় তদন্তেও তেমন অগ্রগতি হয় না। রাজধানীতে বেশিরভাগ নবজাতকের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে। রাজধানীর বাইরে স্থানীয় সরকারি হাসপাতালে। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট তেমন একটা কাজে আসে না। এসব কারণে দায়ী ব্যক্তি থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এসব নবজাতকের লাশ দাফনের দায়িত্ব পড়ে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের ওপর। তাদের হিসাব মতে মাসে গড়ে ৮/৯টি নবজাতকের লাশ দাফন করছে তারা। তবে এ সংখ্যা মোট নবজাতকের লাশের ১০ শতাংশ বলে জানান তারা।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন ও ফরেনসিক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, প্রতিমাসে গড়ে ১০টি নবজাতকের লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়। এর মধ্যে বেশিরভাগই অবৈধ গর্ভপাতের সময় মারা যায়। বাকিগুলা সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে জন্মের পর হত্যা করে ফেলে দেয়া লাশ।
আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের সহকারী পরিচালক (সার্ভিস) আবদুল হালিম জানান, প্রতিবছর গড়ে ৯০ থেকে ১১০টি নবজাতকের লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করেন তারা। তবে এ সংখ্যা মোট নবজাতকের লাশের ১০ শতাংশ। সামপ্রতিক সময়ে বেওয়ারিশ নবজাতকের লাশের হার বেড়েছে বলে জানান তিনি।
১৯ মার্চ (শনিবার) একই দিনে এক ঘণ্টার ব্যবধানে বাড্ডা ও ভাসানটেক থেকে দুই নবজাতকের মৃতদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে বাড্ডার স্বাধীনতা সরণির খানকা শরীফের পাশের ময়লার স্তূপ থেকে এক মেয়ে নবজাতকের দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন মৃতদেহ ও ভাসানটেক এলাকার বিআরপি পুনর্বাসন প্রজেক্টের কবরস্থানের পাশ থেকে অপর এক ছেলে নবজাতকের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।
বাড্ডা থানার এসআই জয়ন্ত কুমার মণ্ডল জানান, সকাল ১০টার দিকে খানকা শরিফের পাশে একটি ময়লার স্তূপে দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় নবজাতকের লাশটি উদ্ধার করে ঢামেক হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ধারণা করা হচ্ছে অবৈধ গর্ভপাতের পর নবজাতককে গলা কেটে হত্যার পর ওই ময়লার স্তূপে কেউ ফেলে গেছে।
অপরদিকে ভাসানটেক থানার এসআই নুরুজ্জামান জানান, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিআরপি পুনর্বাসন প্রজেক্টের পাশের কবরস্থান থেকে প্রিন্টের কাপড়ে মোড়ানো এক ছেলে নবজাতকের লাশ উদ্ধার করা হয়। নবজাতকটির বয়স ১ দিন হতে পারে। এ ঘটনায়ও ধারণা করা হচ্ছে অবৈধ গর্ভপাতের পর নবজাতককে হত্যার পর ওখানে ফেলে রাখতে পারে কেউ।
এর আগে ১৫ মার্চ (মঙ্গলবার) রাজধানীর পূর্ব বাড্ডা থেকে টি-শার্টে মোড়ানো অবস্থায় একটি ব্যাগের ভেতর থেকে এক মেয়ে নবজাতকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ৪ মার্চ রাজধানীর ধানমণ্ডি ও ভাটারা থেকে উদ্ধার করা হয় দুই নবজাতকের লাশ। ২৭ ফেব্রুয়ারি পল্লবীর একটি ড্রেন থেকে এবং ৫ ফেব্রুয়ারি হাতিরঝিল থেকে উদ্ধার হয় আরো দুই নবজাতকের লাশ।
তবে এসবের মধ্যে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ১ ফেব্রুয়ারি। রাজধানীর বেইলি রোডে ছয় তলা থেকে নিজের ঔরসজাত সন্তানকে হত্যার উদ্দেশ্যে ফেলে দেয় বিউটি নামে এক কিশোরী মা। তার দুলাভাইয়ের (বোনের স্বামী) সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের ফলে এ সন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু লোকলজ্জার ভয়ে সে তার সন্তানকে ফেলে দিয়েছে বলে জানায় ওই কিশোরী। তবে শিশুটি অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেও চিকিত্সাধীন অবস্থায় কয়েকদিন পর মারা যায়।
গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর পুরনো বিমানবন্দরের ভেতরের রানওয়ের পাশে একটি জঙ্গল থেকে এক নবজাতককে উদ্ধার করেন স্থানীয় গৃহবধূ জাহানারা বেগম। নবজাতকটিকে কয়েকটি কুকুর খুবলে খাওয়া শুরু করেছিল। এ সময় কয়েকটি শিশু খেলতে গিয়ে নবজাতকটির কান্না শুনে গিয়ে এ ঘটনা দেখে তাকে জানায়। পরে জাহানারা নবজাতকটিকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। শিশুটির নাক মুখ ও আঙ্গুল কামড়ে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে কুকুর। চিকিত্সকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে ও সেবায় ওই শিশুটি ফিরে পায় তার নতুন জীবন। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যায় ওই নবজাতক।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মারুফ হাসান সরদার বলেন, নবজাতকের লাশ উদ্ধারের ঘটনাগুলোর বেশিরভাগ একেবারেই ক্লুলেস। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় কেউ অভিযোগও করে না। তাই কিছু কিছু তদন্তে অগ্রগতি হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তদন্তে তেমন অগ্রগতি হয় না।
সর্বশেষ ৪ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় ডিএনডি খাল থেকে এক নবজাতকের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। পুলিশের ধারনা নবজাতকটিকে কেউ হত্যা করে লাশ ডিএনডি খালের পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছে। এর একদিনের পরেই গত ৫ এপ্রিল সকালে সিরাজগঞ্জ সদরের শিয়ালকোল ইউনিয়নের বড় হামকুড়িয়ার একটি কালভার্টের নিচে পানিতে ভাসতে থাকা এক নবজাতকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
সিরাজগঞ্জ সদর থানার এসআই হাফিজ রায়হান জানান, ধারণা করা হচ্ছে অবৈধ গর্ভপাত ঘটানোর পর শিশুটির লাশ ভোরে ব্রিজের নিচে ফেলে রাখা হয়েছে।
এছাড়া, ২১ মার্চ সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রাজশাহীর পুরনো পাসপোর্ট অফিস সংলগ্ন হেতেমখাঁ এলাকার ড্রেন থেকে এক মেয়ে নবজাতকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
নগরীর বোয়ালিয়া থানার ওসি শাহাদাত জানান, পুলিশ ওই কন্যা শিশুর লাশ উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। ধারণা করা হচ্ছে নবজাতকের বয়স একদিন। রাতের কোনো এক সময় ওই নবজাতকের লাশ গুম করতে ড্রেনে ফেলা হয়েছে। তবে ওই নবজাতকের পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম চৌধুরী বলেন, সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে নারী যে এখনো নিরাপত্তাহীন এসব ঘটনা তারই প্রমাণ। এসব ক্ষেত্রে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। আর রাষ্ট্রকেই এ দায়িত্ব নিতে হবে। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তাদের দায়িত্ব এড়াতে পারে না। পুলিশ বিভাগ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।
সূত্র: মানবকণ্ঠ

Be the first to comment on "ড্রেন ও ময়লার ভাগাড়ে নবজাতকের লাশ-বাড়ছে সামাজিক অপরাধ"