নিউজ ডেস্ক: ঢাকার সাভারে ইতিহাসের ভয়াবহতম রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় হত্যা ও ইমারত আইনে দায়ের করা দু’টি মামলার নথি বিচারের জন্য প্রস্তুত হয়েছে। মামলা দু’টি বিচারের জন্য ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানো হয়েছে। কারাগারে আটক আসামিসহ মামলার সকল আসামিকে আগামি ২৮ এপ্রিল আদালতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আগামি ২৮ এপ্রিল আসামিদের উপস্থিতি ছাড়াও মামলা বিচারের জন্য আমলে গ্রহণ করবেন আদালত। এরপর মামলাটি চার্জের জন্য দিন ধার্য করা হবে। চার্জ গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে ভয়াবহতম রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাটি দু’টির বিচার।
নথি প্রস্তুত হলেও মামলার ৪১ আসামির মধ্যে এখনও ১২ আসামি পলাতক রয়েছেন। তাদের অনুপস্থিতিতে বিচার সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
মামলাটির রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলি আনোয়ারুল কবির বাবুল জানান, মামলা দু’টিতে ৬ জন আসামি কারাগারে আটক আছেন। ২৩ আসামি জামিনে আছেন। বাকি ১২ আসামি পলাতক। ২৮ এপ্রিল মামলাটি আমলে গ্রহণ ও পরবর্তী তারিখে চার্জ গঠনের মধ্য দিয়ে মামলা দু’টির বিচার শুরু হবে। আসামিদের মধ্যে ১২ সরকারি কর্মকর্তা রয়েছেন।
মামলা দু’টির মধ্যে হত্যা মামলাটি ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে এবং ইমারত নির্মাণ আইনে দায়ের করা মামলাটি ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
দুই মামলার সাক্ষীর সংখ্যা ৭২৯ জন। সাক্ষীদের মধ্যে রয়েছেন নিহতদের স্বজনদের জবানবন্দি, জীবিত উদ্ধারকৃতদের জবানবন্দি, বিভিন্ন হাসপাতালের ডাক্তার-নার্সদের জবানবন্দি, উদ্ধারকর্মীদের জবানবন্দি, বিভিন্ন সংস্থার তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন সংগ্রহ ও তাদের জবানবন্দি, রানা প্লাজার বাণিজ্যিক ভবনে গার্মেন্টস কারখানা স্থাপনে সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ ও দায়িত্ব নির্ধারণ প্রক্রিয়া নির্ণয়, নকশা অনুমোদনকারীদের জবানবন্দি, নিরপেক্ষ সাক্ষী ও মিডিয়া কর্মী।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ইতিহাসের ভয়াবহতম রানা প্লাজা ধসের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় দু’টি মামলা দায়ের করা হয়। একটি মামলা হয় অবহেলায় মৃত্যু ঘটানোর অভিযোগে দণ্ডবিধির ৩০৪ক/৩৩৭/৩৩৮ ধারায় এবং অপর মামলাটি করা হয় ইমারত নির্মাণ আইন ১৯৫২ এর ১২ ধারায়। পরে প্রথম মামলাটিতে ৩২৩/৩২৫/৩২৬/৩০৭ ও ৩০৪ ধারা সংযোজন করা হয়।
গত বছরের ১ জুন রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় দায়ের করা দু’টি মামলায় হত্যা ও ইমারত নির্মাণ আইনে পৃথক দু’টি চার্জশিট দেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সিনিয়র এএসপি বিজয় কৃষ্ণ কর। দণ্ডবিধির মামলায় ৪১ জন ও ইমারত নির্মাণ আইনের মামলায় ১৮ জনকে আসামি করা হয়েছে।
চার্জশিটভুক্ত আসামিরা হলেন- ভবন মালিক সোহেল রানা, তার বাবা আব্দুল খালেক ওরফে কুলু খালেক ও মা মর্জিনা বেগম, সাভার পৌরসভার মেয়র আলহাজ রেফাত উল্লাহ, কাউন্সিলর মোহাম্মাদ আলী খান, প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, উপ-সহকারী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান রাসেল, নিউওয়েব বাটন লিমিটেডের চেয়ারম্যান বজলুস সামাদ আদনান, নিউওয়েব স্টাইপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুর রহমান তাপস, ইথার টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান ওরফে আনিসুজ্জামান, আমিনুল ইসলাম, সাইট ইঞ্জিনিয়ার মো. সারোয়ার কামাল, আবু বক্কর সিদ্দিক, মো. মধু, অনিল দাস, মো. শাহ আলম ওরফে মিঠু, মো. আবুল হাসান, সাভার পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উত্তম কুমার রায়, সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, নগর পরিকল্পনাবিদ ফারজানা ইসলাম, কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের সাবেক উপ-প্রধান পরিদর্শক মো. আব্দুস সামাদ, উপ-প্রধান পরিদর্শক মো. জামশেদুর রহমান, উপ-প্রধান পরিদর্শক বেলায়েত হোসেন, পরিদর্শক প্রকৌশল মো. ইউসুফ আলী, মো. শহিদুল ইসলাম, ইমারত পরিদর্শক মো. আওলাদ হোসেন, ইথার টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপণা পরিচালক জান্নাতুল ফেরদৌস, মো. শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া, মনোয়ার হোসেন বিপ্লব, মো. আতাউর রহমান, মো. আব্দুস সালাম, বিদ্যুৎ মিয়া, সৈয়দ শফিকুল ইসলাম জনি, রেজাউল ইসলাম, নান্টু কন্ট্রাকটার, মো. আব্দুল হামিদ, আব্দুল মজিদ, মো. আমিনুল ইসলাম, নয়ন মিয়া, মো. ইউসুফ আলী, তসলিম ও মাহবুবুল আলম।
ঢাকার জেলা প্রশাসক অফিসে রক্ষিত হিসাব অনুযায়ী, রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে ২ হাজার ৪৩৮ জনকে জীবিত এবং ১ হাজার ১১৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ১৯ জন মারা যান। সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ১৩৬ জনে। ১ হাজার ৫শ’ ২৪ জন আহত হন। ২৯১ জনের মরদেহ অশনাক্তকৃত অবস্থায় জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
সর্বশেষ ২০১৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পাবনার বেড়ায় রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিক আব্দুস সোবহান মারা যান।
এ ঘটনায় দু’টি মামলার মধ্যে একটি মামলা করেন সাভার থানার এসআই ওয়ালী আশরাফ খান। তিনি ২০১৩ সালের ২৫ এপ্রিল সাভার থানায় ফৌজদারি কার্যবিধিতে মামলাটি দায়ের করেন।
অপর মামলাটি দায়ের করেন রাজউকের অথরাইজড অফিসার হেলাল আহম্মেদ। তিনি ২৪ এপ্রিল ভবন ধসের দিনই জাতীয় ইমারত বিধি লঙ্ঘনের দায়ে মামলাটি দায়ের করেন।
আহত ও নিহতদের ক্ষতিপূরণ দিতে ২০১৫ সালের ১৩ মার্চ আদালতের নির্দেশে রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানার ব্যক্তিগত সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে সরকার।
সূত্র: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

Be the first to comment on "রানা প্লাজা মামলা-বিচারের জন্য প্রস্তুত, এখনও পলাতক ১২"